জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধি হয়ে সংসদে যাচ্ছেন শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা
ফাইল ছবি
জুলাই বিপ্লবের শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর দক্ষিণখানে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় ছয় বছর বয়সী জাবির। সেই শহীদের স্মৃতি ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতেই সাবেক স্কুলশিক্ষিকা রোকেয়া বেগমকে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম জানান, জামায়াত ও শরিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ১১ দলের জোটের জন্য নির্ধারিত ১৩টি আসনের প্রার্থীর তালিকা প্রায় চূড়ান্ত। আগামীকাল আনুষ্ঠানিকভাবে এই নামগুলো ঘোষণা করা হবে এবং ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে প্রয়োজনীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল এক ঐতিহাসিক দিন। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতনের সেই বিকেলে সারা দেশে যখন বিজয়ের উল্লাস, ঠিক তখনই উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বাইতুস সালাম মাদ্রাসা গেট সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে বিদ্ধ হয় শিশু জাবির।
দক্ষিণখানের কে. সি. মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের নার্সারির ছাত্র জাবির ছিল বাবা-মায়ের ছোট সন্তান। মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের এই শিশুটি খেলনার বদলে পরিত্যক্ত জিনিস দিয়ে চমৎকার হ্যান্ডক্রাফট তৈরি করতে পারদর্শী ছিল। বড় হয়ে আর্মি অফিসার হওয়ার স্বপ্ন দেখা জাবির সেই বিকেলে বাবা-মায়ের সাথে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে বের হয়েছিল। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরা পূর্ব থানা ও এপিবিএন সদস্যদের অতর্কিত গুলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
আহত জাবিরকে নিয়ে তার বাবা কবির হোসাইন ও মা রোকেয়া বেগম এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটেছেন। প্রথমে ক্রিসেন্ট হাসপাতাল এবং পরে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আইসিইউর অভাবে জাবিরকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা রক্তক্ষরণের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে জাবিরকে মৃত ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘বুলেট ইনজুরি অন থাই’ উল্লেখ করা হয়েছে। ছেলের মৃত্যুতে দিশেহারা মা রোকেয়া বেগম তখন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি কোনো দলের না, আমি একজন মা। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরেও আমি আমার কলিজার টুকরোকে বাঁচাতে পারিনি। আমি প্রতিটি সন্তান হত্যার বিচার চাই।’
মর্মান্তিক এই ঘটনার পর জাবিরের দাফন নিয়েও পোহাতে হয়েছিল নানা প্রতিকূলতা। শেষ পর্যন্ত রাত দেড়টায় উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর সংলগ্ন কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। জাবিরের ফেলে যাওয়া সাইকেল, বই আর খেলনাগুলো এখনো তার স্মৃতি বহন করে চলেছে।
জাবিরের বাবা-মা এখন একটি নিরাপদ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে আর কোনো শিশুকে গুলিতে প্রাণ হারাতে হবে না। সেই লক্ষ্য ও শহীদ পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই রোকেয়া বেগমকে সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। জাবিরের এই আত্মত্যাগ আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের পথচলায় এক অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে।