হিজবুল্লাহর নতুন অস্ত্র ফাইবার অপটিক ড্রোন কেন প্রতিরোধ্য
সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সংঘাতে উত্তর ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে লেবাননের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। এটা মূলত একটি ছোট ড্রোন যা ফাইবার অপটিক ক্যাবল দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এ কারণে এই ড্রোনগুলো ইলেকট্রিক শনাক্তকরণ যন্ত্র এড়াতে সক্ষম। তবে ছোট হলেও এগুলো মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এই ধরনের ড্রোন এরই মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সাধারণ ড্রোনগুলো অনেক সময় ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করা যায়, ফলে সেগুলো ভেঙে পড়ে বা ফিরে যায়। কিন্তু এই ফাইবার অপটিক ড্রোনগুলো সরাসরি একটি পাতলা তারের মাধ্যমে অপারেটরের সঙ্গে যুক্ত থাকে—যার প্রস্থ প্রায় ডেন্টাল ফ্লসের মতো। ফলে এগুলোকে ইলেকট্রনিকভাবে জ্যাম করা সম্ভব নয়।
তবে এই ড্রোন পুরোপুরি নির্ভুল নয়। বাতাস বা অন্য ড্রোনের কারণে তার জড়িয়ে যেতে পারে। তারপরও বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এগুলো অত্যন্ত প্রাণঘাতী হতে পারে। এগুলো নিচু দিয়ে উড়ে লক্ষ্যবস্তুতে গোপনে আক্রমণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ড্রোন ঠেকাতে হলে হয় মাঝপথে ভূপাতিত করতে হবে—যা কঠিন, কারণ এগুলো ছোট এবং খুব কম দূরত্বে উড়ে—অথবা প্রায় অদৃশ্য সেই তার কেটে দিতে হবে। জানা গেছে, ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি মূলত দক্ষিণ লেবানন বা সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থানরত ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে এসব ড্রোন ব্যবহার করছে।
একটি নতুন অস্ত্র যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী
একজন ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা মার্কিন সংবাদমাধ্যম বলেছেন, হিজবুল্লাহর সাথে সাম্প্রতিক লড়াইয়ের সময় ফাইবার অপটিক ড্রোনগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, হিজবুল্লাহ সম্ভবত সম্প্রতি এই ড্রোনগুলোর দিকে ঝুঁকেছে কারণ ইসরাইলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপেক্ষকৃত বড় আকারের শক্তিশালী রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য ড্রোনের বিরুদ্ধে সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, ইসরাইল মনে করে যে, ড্রোনগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি এবং উৎপাদন করা সহজ – এর জন্য সাধারণ বাজারে সহজলভ্য একটি ড্রোন, অল্প পরিমাণ বিস্ফোরক এবং স্বচ্ছ তার ছাড়া আর বিশেষ কিছুর প্রয়োজন হয় না।
এই কর্মকর্তা ড্রোনগুলোকে লেবাননের ভেতরে থাকা ইসরাইলি সেনাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে অভিহিত করেছেন। তবে তিনি এও বলেছেন যে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বিষয়টা প্রযুক্তিগতভাবে সমাধানের জন্য কাজ করছে। তিনি জানান, এরই মধ্যে ইসরাইল সেনাদের সুরক্ষার জন্য স্থলভাগে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে, যেমন সামরিক যানবাহনে লোহার জাল এবং খাঁচা যুক্ত করা।
তবে যেখানে উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ড্রোনগুলো ঠেকানো যাচ্ছে না, সেখানে লোহার জাল বা খাঁচা কতটুকু কাজে আসবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ডের সাবেক প্রধান রান কোচাভ বলেছেন, ফাইবার-অপটিক ড্রোনগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার প্রচেষ্টায় ইসরাইল ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এগুলো খুব নিচু দিয়ে এবং খুব দ্রুত ওড়ে। আর এগুলো খুবই ছোট, তাই এগুলোকে শনাক্ত করা খুব কঠিন এবং শনাক্ত করার পরও এদের গতিপথ অনুসরণ করা সত্যিই খুব দুরূহ।’
কোচাভ বলেছেন, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে সুরক্ষা উন্নত করতে ইসরাইল বছরের পর বছর ধরে তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু ড্রোনকে শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়নি।
তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে ফাইবার-অপটিক ড্রোনের অগ্রগতি ইসরাইলের অনুসরণ করা উচিত ছিল এবং ধরে নেয়া উচিত ছিল যে রাশিয়ার মতো ইরানের অন্যান্য মিত্ররাও অবশেষে এগুলো ব্যবহার করবে।
ইউক্রেন যুদ্ধে প্রযুক্তির দৌড়
ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কো ও কিয়েভ যেন নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। রাশিয়া মূলত ইরানের তৈরি দূরপাল্লার শাহেদ ড্রোন দিয়ে প্রায় প্রতি রাতেই ইউক্রেনের ওপর হামলা চালায়। যদিও মস্কো ড্রোনগুলোর ওপর কাজ করে আরও অনেক উন্নতি করেছে, তবুও ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে কিছু ড্রোনকে ভূপাতিত করা সম্ভব।
আর এই সমস্যা এড়ানোর জন্যই ফাইবার-অপটিক ড্রোন তৈরি করা হয়েছে – যদিও রেডিও লিঙ্ক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে দিক নির্ণয়কারী ড্রোনের মতো এগুলোর পাল্লা ততটা বেশি নয়। লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ড্রোন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক রবার্ট টোলাস্ট বলেন, কিছু ক্ষেত্রে ফাইবার-অপটিক ড্রোনগুলোকে ৩১ মাইল (৫০ কিলোমিটার) পর্যন্ত বিস্তৃত তার নিয়ে উড়তে দেখা গেছে।
তিনি বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন ‘অভূতপূর্ব মাত্রায়’ বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলমান এই যুদ্ধে কিয়েভ নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে তাদের প্রধান ভরসার হয়ে উঠেছে ড্রোন। বিভিন্ন ধরনের ড্রোন তৈরি করছে দেশটি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ফাইবার-অপটিক ড্রোন।
ফাইবার-অপটিক ড্রোনগুলোর ব্যবহার এতটাই ব্যাপক যে, ফুটেজে দেখা যায় ইউক্রেনের সম্মুখসারির শহরগুলো চকচকে, মাছ ধরার সুতোর মতো তারে ছেয়ে গেছে, যা সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা বিশাল মাকড়সার জালের মতো দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ কোচাভ বলেন, ড্রোন প্রতিহত করার জন্য ইসরাইলের যথেষ্ট অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, কিন্তু মূল বিষয় হলো আগেভাগে শনাক্তকরণ। বিষয়টার ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন যে, ইসরাইলের কাছে ইতিমধ্যেই এমন উপযুক্ত প্রযুক্তি রয়েছে যা আলোর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে, সংকেত ও যোগাযোগ শনাক্ত করে এবং ড্রোনের প্রপেলারের শব্দও চিনতে পারে।
কিন্তু এই নজরদারি ব্যবস্থাগুলো উত্তর সীমান্তে ব্যাপকভাবে মোতায়েন করা হয়নি। আর সেই সুযোগটাই নিচ্ছে হিজবুল্লাহ। গত কয়েক সপ্তাহে হিজবুল্লাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তাদের আল-মানার টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে এই নতুন ড্রোন দিয়ে হামলার ভিডিও প্রচার করেছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সেনাদের ওপর চালানো হামলার ভিডিওগুলো রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে।
গত সপ্তাহান্তে এমনই একটি হামলায় এক ইসরাইলি সেনা নিহত এবং আরও ছয়জন আহত হয়, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। এরপর গত মঙ্গলবারের (২৮ এপ্রিল) আরেকটি হামলায় দক্ষিণ লেবাননে একজন ইসরাইলি বেসামরিক ঠিকাদার নিহত হন।
যে হামলায় সেনা নিহত হয়, সেই হামলায় হিজবুল্লাহ একটি ড্রোনের ভিডিও প্রকাশ করে, যা একটি গাড়ির কাছে জড়ো হওয়া সেনাদের মাঝখানে বিস্ফোরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ধারণ করা হয়েছিল।
ভিডিওতে দেখা যায়, আহতদের সরিয়ে নেয়ার জন্য একটি সামরিক হেলিকপ্টার অবতরণ করেছে। ওই মুহূর্তে সেই স্থানে একটি ড্রোন ছোড়া হয়। সেটি অল্পের জন্য হেলিকপ্টারে আঘাত করতে পারেনি। তবে খুব কাছেই বিস্ফোরিত হয়।
হিজবুল্লাহ ঘোষণা করেছে যে, বছরের পর বছর ধরে অন্যান্য ধরনের ড্রোন ব্যবহার করার পর গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ের পর্বে তারা প্রথমবারের মতো ফাইবার-অপটিক গাইডেড ড্রোন ব্যবহার শুরু করেছে। তবে ড্রোনগুলো ভূপাতিত করতে ইসরাইল ব্যর্থ হচ্ছে যা তাদের নাগরিকদের ভীত ও সন্ত্রস্ত করে তুলেছে।
ইসরাইলেরও একটি ড্রোন বহর রয়েছে যা হিজবুল্লাহ জঙ্গিদের লক্ষ্য করে নজরদারি ও হামলা চালায়, যদিও তারা সবসময় ফাইবার অপটিক্স কেবল ব্যবহার করে না। উত্তর ইসরাইলের কিরিয়াত শিমোনা শহরের ৭৮ বছর বয়সি শিক্ষক এবং স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বুলেন্স চালক জেভিক গ্লিদাই বলেন, ‘আমরা এই ড্রোনগুলো নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন, কারণ এগুলোকে গুলি করে নামানোর কোনো উপায় নেই। কারণ আমরা এগুলোকে শনাক্ত করতে পারি না।’
তিনি জানান, সম্প্রতি একটি ড্রোন তার বাড়িতে বিধ্বস্ত হয়। কিন্তু এর আগে কোনো সতর্কতামূলক সাইরেন বাজেনি। ভাগ্য ভালো যে, সেটা বিস্ফোরিত হয়নি। ঘটনাস্থলে আসা বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এটাকে একটি ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করে।
গ্লিদাই বলেন, ‘তারা আমাকে বলল, ‘আপনার ভাগ্য খুব ভালো।’ তার দাবি, কিরিয়াত শিমোনায় তার ৪৮ বছরের জীবনে তিনি হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের সম্মুখীন হয়েছেন, তবে এই ড্রোনটা একেবারেই নতুন। তিনি বলেন, ‘তারা (উদ্ধারকারী দল) যতগুলো টুকরো কুড়িয়ে নিতে পেরেছে, সব তুলে নিয়েছে এবং স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আমার জন্য কয়েকটি অপটিক্যাল ফাইবার রেখে গেছে।’
তথ্যসূত্র: এপি