হান্টাভাইরাস কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
প্রতিকী ছবি
হান্টাভাইরাস একটি বিরল রোগ যা সাধারণত সংক্রামিত ইঁদুরের মূত্র বা মলের সংস্পর্শে আসার কারণে হয়। আটলান্টিক মহাসাগরে নেদারল্যান্ডসের একটি প্রমোদতরীতে এর প্রাদুর্ভাবের পর তিনজনের মৃত্যুর জন্য সন্দেহ করা হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, জাহাজে একটি হান্টাভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আরও পাঁচজন আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে যাদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
শুরুতে হান্টাভাইরাসের উপসর্গ ফ্লু-এর মতো হতে পারে, যেখানে রোগীরা ক্লান্তি, জ্বর, কাঁপুনি ও ব্যথায় ভোগেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ভাইরাসটি হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস বা কিডনির ক্ষতি করলে রোগীরা তীব্র শ্বাসকষ্ট, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল হওয়া এবং এমনকি মৃত্যুর মুখেও পড়তে পারেন।
ডাব্লিউএইচও সোমবার (৪ মে) বলেছে যে, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই এবং সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি কমই রয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা বুঝতে পারছেন না যে কীভাবে এই রোগটি প্রমোদতরীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হান্টাভাইরাস কী?
হান্টাভাইরাস হলো এক প্রকার ভাইরাস যা ইঁদুরজাতীয় প্রাণী তাদের দেহরস এবং মলমূত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। মানুষ প্রায়ই ইঁদুরের শুকনো মলের কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে সংক্রমিত হয়। সাধারণত এটি ঘটে যখন কেউ ঝাড়ু দিয়ে ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার চেষ্টা করে, যার ফলে কণাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে সাধারণ হান্টাভাইরাসটি ডিয়ার মাউসের মাধ্যমে ছড়ায়। দূষিত বস্তু স্পর্শ করে এবং তারপর তাদের মুখ বা নাক স্পর্শ করার মাধ্যমেও মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।
হান্টাভাইরাস ইঁদুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে, যদিও এটি বিরল। শুধুমাত্র একটি হান্টাভাইরাস (দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় অ্যান্ডিস স্ট্রেন) মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে বলে জানা গেছে এবং এটাও বিরল।
হান্টাভাইরাসের লক্ষণগুলো কী কী?
হান্টাভাইরাস দুই ধরনের গুরুতর অসুস্থতা ঘটায়। ইউরোপ ও এশিয়ায় পাওয়া হান্টাভাইরাস হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (এইচএফআরএস) ঘটাতে পারে, যা কিডনির ক্ষতি করে। মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা এবং বমি বমি ভাব দিয়ে যা শুরু হয়, তা পরবর্তীতে নিম্ন রক্তচাপ, অভ্যন্তরীণ রক্তপাত এবং তীব্র কিডনি বিকলতায় পরিণত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্যানুসারে, ৫-১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক হতে পারে এবং সংক্রমণের পর উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগে।
আমেরিকায় পাওয়া এই ভাইরাস হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস) ঘটায়। এই রোগটি, যা ফুসফুসের ক্ষতি করে, প্রাথমিকভাবে ফ্লুর মতো উপসর্গ সৃষ্টি করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ফুসফুসে তরল জমে যাওয়ার কারণে কিছু রোগী শ্বাসকষ্ট এবং বুকে চাপ অনুভব করতে পারেন।
সংক্রমণের পর উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে এক থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। সিডিসি জানিয়েছে, যাদের শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গ দেখা দেয়, তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ এইচপিএস-এ মারা যেতে পারেন।
হান্টাভাইরাসের কি কোনো প্রতিকার আছে?
সিডিসির মতে, হান্টাভাইরাসের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। রোগীদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান, বিশ্রাম এবং নির্দিষ্ট উপসর্গের চিকিৎসার মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে। সেই কারণে প্রতিরোধ গুরুত্বপূর্ণ।
সিডিসি বলছে, হান্টাভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ইঁদুর জাতীয় প্রাণীকে আপনার বাড়ি থেকে দূরে রাখা – বাড়ির যেকোনো ফাঁক বা ছিদ্র বন্ধ করে, খাবার ভালোভাবে মুখবন্ধ করে রেখে এবং ময়লা শক্ত ঢাকনাযুক্ত পুরু পাত্রে ফেলে।
ইঁদুরের মল পরিষ্কার করার সময়, দস্তানা ব্যবহার করুন, বর্জ্যের উপর ব্লিচ দ্রবণ স্প্রে করুন এবং পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর কাগজের তোয়ালে দিয়ে জায়গাটি মুছে ফেলুন এবং নিরাপদে ফেলে দিন।
হান্টাভাইরাস কতটা সাধারণ?
২০২৪ সালের একটি সমীক্ষা অনুসারে, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষ এইচএফআরএস-এ আক্রান্ত হন, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ঘটে চীনে। সিডিসির তথ্যানুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে হান্টাভাইরাস রোগে আক্রান্তের ৮৯০টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই পশ্চিমা অঙ্গরাজ্যগুলোতে।
গত বছর অস্কার বিজয়ী অভিনেতা জ্য হ্যাকম্যানের স্ত্রী বেটসি আরাকাওয়া ৬৫ বছর বয়সে এইচপিএস-এ মারা যাওয়ার পর এই স্বল্প-পরিচিত রোগটি নিয়ে আগ্রহ বেড়ে যায়।
সিএনএন স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের নথির বরাতে জানায়, নিউ মেক্সিকোতে ওই দম্পতির সম্পত্তির বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্ন বহিঃস্থ ভবনে মৃত ইঁদুর এবং ইঁদুরের বাসা পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, আরাকাওয়া তার স্বামীর মৃত্যুর প্রায় এক সপ্তাহ আগে মারা যান, যিনি আলঝেইমার রোগের গুরুতর পর্যায়ে ছিলেন।
জাহাজে হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবটি কীভাবে ঘটল?
এখনও জানা যায়নি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও মহামারী বিশেষজ্ঞ ডঃ শার্লট হ্যামার বলেছেন, এর একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইঁদুর জাতীয় প্রাণীর জাহাজে চড়ে আসাটা একেবারে অস্বাভাবিক নয়, যা একটি সম্ভাবনা হতে পারে।’
হ্যামার আরও বলেন, যেহেতু এই রোগের সুপ্তিকাল এক থেকে আট সপ্তাহ, তাই এটাও সম্ভব যে জাহাজটি শেষবার আর্জেন্টিনার বন্দরে ভেড়ার সময় মানুষ সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হলো ‘মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ’, যা তার মতে এই মাত্রায় ‘অত্যন্ত অসম্ভব’।
জাহাজে রোগটি কীভাবে ছড়িয়েছে তার কারণ জানতে প্রিমিয়ার মেডিকেল গ্রুপের পারিবারিক চিকিৎসক এবং প্রেসিডেন্ট ও সিইও ডঃ স্কট মিসকোভিচ বলেছেন, ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য সেগুলোকে ইনকিউবেট করার প্রক্রিয়া হিসেবে জাহাজটিকে ‘সর্বোচ্চ মাত্রায় কালচার’ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘরের সমস্ত ড্রপলেট, সমস্ত ধুলো, সমস্ত রান্নাঘর, সমস্ত ভেন্টিলেশন সিস্টেম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে তারপর কালচার করতে হবে।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ভাইরাসটির সিকোয়েন্সিংসহ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন