আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেয়েও ভয়ংকর এখন সাইবারওয়ার্ল্ড
প্রতীকী ছবি
ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের অপরাধজগৎকে বলা হয় আন্ডারওয়ার্ল্ড। এ জগতের নিয়ন্ত্রণ থাকে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাতে। একটা সময় ছিল যখন এই আন্ডারওয়ার্ল্ড কেবল অপরাধজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করত না, তারা রাজনীতি এবং অর্থনীতিতেও প্রভাব বিস্তার করত। ক্ষমতাসীনরা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বিরোধে জড়ালে দেশ অশান্ত হতো।
অনেক ব্যবসায়ী ভয়ে তাদের চাঁদা দিতেন। কেউ নিরাপদে ব্যবসা করার জন্য তাদের সঙ্গে সমঝোতা করতেন। কিন্তু আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই দিন আর নেই। অপরাধ জগতের সেই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে সাইবারওয়ার্ল্ড।
সাইবার অপরাধ এখন আন্ডারওয়ার্ল্ডের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন মানুষের সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শত্রু। নীরব ঘাতক। সাইবার বুলিংয়ের কারণে বহু মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।
অনেকের জীবন তছনছ হয়ে যাচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছে বহু মানুষ। অথচ এসব প্রতিরোধে নেই কোনো আইন। ফলে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন জন আতঙ্কের অন্যতম প্রধান কারণ। নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কিছু মানুষ ক্রমে হিংস্র হয়ে উঠছে।
আগে মানুষ প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সন্ত্রাসী ভাড়া করত। মস্তান দিয়ে অন্যকে ভয় দেখাত। পেশিশক্তি ছিল ভিন্নমত দমনের প্রধান হাতিয়ার। এখন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর বদলে সাইবার সন্ত্রাসীদের কদর বেশি। এখন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কেউ সন্ত্রাসী বা মস্তান ভাড়া করে না, ভাড়া করে সাইবার সন্ত্রাসী। এখন নারীকে হেনস্তা করতে অ্যাসিড নিক্ষেপ করা হয় না, তাকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করা হয় ফেসবুকে কিংবা ইউটিউবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী শতকরা ৯০ ভাগ নারীই সাইবার বুলিংয়ের শিকার। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের মার্চ থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে ১২৭ নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। নানানরকম অশ্লীল এবং কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ সহ্য না করতে পেরে তাঁরা আত্মহত্যা করেন। কিন্তু যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব নারীকে অপমান করেছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এভাবেই চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব এবং মিথ্যাচারের সন্ত্রাস। শুধু নারীদের হেনস্তা করাই সাইবার অপরাধীদের একমাত্র কাজ নয়; বরং ছোটখাটো সাইবার সন্ত্রাসীরা এসব অপরাধে জড়িত। বড় সাইবার সন্ত্রাসীরা করছে আরও বড় অপরাধ। তারা দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করছে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচিত হয় বেসরকারি খাত। সাইবার সন্ত্রাসীদের কারণে বেসরকারি খাত আজ অসহায়, দিশাহারা। সংঘবদ্ধ একটি চক্র সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং উদ্যোক্তাদের টার্গেট করছে। তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। টাকা না দিলেই শুরু হচ্ছে একযোগে আক্রমণ। তাঁদের বিরুদ্ধে একের পর এক অসত্য, ভিত্তিহীন বিভিন্ন কনটেন্ট প্রচার করে তাঁদের কেবল মানসিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। এক পর্যায়ে এসব ব্যবসায়ী-শিল্পপতির কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। অনেক ব্যবসায়ী আতঙ্কিত হয়ে, নিজেদের মানসম্মান রক্ষায় এসব সাইবার চাঁদাবাজের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করছেন। আর যাঁরা সৎ এবং সাহসী তাঁরা এদের অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করছেন না। কিন্তু এর কঠিন মূল্য তাঁদের দিতে হচ্ছে। আগে যেমন অনেকে অন্ধকার জগতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জীবন রক্ষা করতেন, এখন সাইবার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আপস করে চলেন।
দেশে আইন-আদালত থাকলেও সাইবার অপরাধীরা যেন আইনের ঊর্ধ্বে! তাদের বিরুদ্ধে বিচারকরা মামলা নিতে ভয় পান। সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস পায় না। এরা এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে সরকারপ্রধান এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে অরুচিকর, জঘন্য কনটেন্ট প্রচারেও ভয় পায় না। এরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিরাট হুমকি। অতীতের আন্ডারওয়ার্ল্ডের মতোই এখন সাইবারওয়ার্ল্ড ক্রমে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে। সাইবার সন্ত্রাসীরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, মাজার, ধর্মীয় জায়গাগুলোও রেহাই দিচ্ছে না; এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মতো সংবেদনশীল বিষয় নিয়েও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এই যে বিকৃত ছবি ছড়ানো, মানুষকে টার্গেট করে অপপ্রচার চালানো এসব কি সত্যিই স্বাধীন মত প্রকাশের অংশ? আন্তর্জাতিক আইন এ জায়গায় আমাদের একটা সহজ, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ধারা ১৯-এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের নিজের মতামত রাখার এবং তা প্রকাশ করার অধিকার আছে (ইউডিএইচআর, ১৯৪৮, অনুচ্ছেদ ১৯)। সহজভাবে বললে, আপনি কী ভাবছেন বা কী বলছেন সেটা প্রকাশ করা আপনার মৌলিক অধিকার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটসের অনুচ্ছেদ ১৯(৩)-এ বলা হয়েছে, এ অধিকার ব্যবহার করতে গেলে কিছু দায়িত্বও আছে। আর প্রয়োজন হলে আইন করে এ অধিকার সীমিত করা যেতে পারে যদি তা অন্যের সুনাম নষ্ট করে, কারও ক্ষতি করে বা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে (আইসিসিপিআর, ১৯৬৬)। সহজ করে বললে, মত প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু ‘যা খুশি তা-ই বলা’-এর মধ্যে পড়ে না।
বিষয়টা আরও সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কমিটি তাদের সাধারণ মন্তব্য নম্বর ৩৪-এ (২০১১)। সেখানে বলা হয়েছে, আপনি যা বলছেন, তার একটা প্রভাব পড়ে শুধু আপনার ওপর নয়, অন্যদের ওপরও। তাই কথা বলার সময় বিষয়টা মাথায় রাখতে হয় যে এতে কারও ক্ষতি হচ্ছে কি না। যদি কোনো বক্তব্য কারও সম্মান নষ্ট করে বা মানুষকে উসকে দেয়, তাহলে সেটাকে আর সাধারণ মতপ্রকাশ বলা যায় না (এইচআরসি, ২০১১, অনুচ্ছেদ ২১)।
এসব ধারণা হঠাৎ করে আসেনি। এর পেছনে ইতিহাসের একটা কঠিন অভিজ্ঞতা রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী মিথ্যা প্রচার ছড়িয়ে একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরই আন্তর্জাতিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়-মানুষকে কথা বলার অধিকার দিতে হবে; কিন্তু সেই অধিকার ব্যবহার করে যেন ঘৃণা বা ধ্বংস না ছড়ানো যায়।
আজকের বাস্তবতায়, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, সেই একই ঝুঁকি নতুনভাবে সামনে এসেছে। পার্থক্য একটাই-আগে প্রচারণা চালাতে সময় লাগত, এখন কয়েক মিনিটেই তা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। শুধু আইন নয়, এ নিয়ে বেশ কিছু আদালতের রায়ও রয়েছে।
২০০৬ সালে এস্তোনিয়ার জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ডেলফি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে একটি ফেরি কোম্পানির ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করা হয়। স্বাভাবিকভাবেই পাঠকরা নিচে মন্তব্য করতে শুরু করেন।
সমস্যা হয় তখন, যখন কিছু মন্তব্য খুবই অপমানজনক ও হুমকির পর্যায়ে চলে যায়। ডেলফি প্রথমে সেগুলো সরায়নি। পরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আদালতে গেলে ডেলফির যুক্তি ছিল-এ মন্তব্য তারা লেখেনি, তাই তারা দায়ী নয়। কিন্তু ইউরোপিয়ান কোর্ট অব হিউম্যান রাইটস (ইসিএইচআর) ভিন্নকথা বলে। আদালত জানান, ডেলফির মতো বড় প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব ছিল এ ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা। তারা জানার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্ল্যাটফর্মকেও দায়ী করা হয়।
এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট ২০২২ চালু করেছে। এখানে বড় সমাজমাধ্যমগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে, যেন তারা ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং সামাজিক ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে। জার্মানি আরও এক ধাপ এগিয়ে নেটওয়ার্ক এনফোর্সমেন্ট অ্যাক্ট (নেটজডিজি) চালু করেছে। এ আইনে বলা হয়েছে, স্পষ্টভাবে বেআইনি কনটেন্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরাতে হবে, না হলে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে।
এ উদাহরণগুলো আমাদের বলে দেয় নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়া চলতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কোনো আইন নেই। ২০ কোটি মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কাছে রীতিমতো জিম্মি হয়ে আছে। বিএনপি সরকার বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সাইবার অপরাধ দমনে সরকার এখনো কোনো বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেয়নি। জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে সাইবার অপরাধ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতা সরকারকে এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অর্থাৎ এদের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে। তাই সরকারের উচিত এখনই সাইবার অপরাধ দমনে আইন করা। না হলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নির্বাচিত এই সরকারই।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন