হাম সংক্রমণে বিশ্বেও বাংলাদেশের রেকর্ড
প্রতিকি ছবি
দেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত আড়াই দশকের সব রেকর্ড ভেঙে এ বছর হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৬৭ জনে। এর মধ্যে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের দেহে ল্যাবরেটরিতে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।
আক্রান্তদের একটি বিশাল অংশই শিশু হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে জনমনে।
পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪২৫ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগী ছিলেন ৬৮ জন।
জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুকে হামেই মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। গত এক দশকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে এত বেশি সংখ্যক মৃত্যু আর দেখা যায়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত আড়াই দশকে বাংলাদেশে কখনো এক বছরে ৫০ হাজার রোগী পাওয়া যায়নি। এর আগে ২০০৫ সালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ৯৩৪ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল।
এরপর থেকে সংক্রমণ ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করলেও এ বছরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমনকি ২০২৫ সালেও যেখানে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে এ বছর মাত্র দুই মাসের কম সময়ে সংক্রমণ কয়েকশ গুণ বেড়ে গেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা এই পরিস্থিতিকে মারাত্মক বলে অভিহিত করেছেন। দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে সংক্রমণের এই হার বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তাদের মতে, এত অল্প সময়ে এই বিপুল পরিমাণ মানুষের আক্রান্ত হওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় ধরনের সংকেত।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারের হামের প্রাদুর্ভাব সত্যিই একটি অস্বাভাবিক এবং আশঙ্কাজনক ঘটনা।
এই সংক্রমণের পেছনে গত বছরে পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচিতে যে স্থবিরতা ছিল, তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে এখন। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টির ঘাটতিও রোগের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৫০ হাজারের বেশি হাম রোগী পাওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশ এখন পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে। এর আগে ভারত, ইউক্রেন, মাদাগাস্কার এবং কঙ্গোর মতো দেশে এই পরিমাণ রোগী দেখা গিয়েছিল। তবে কঙ্গোর মতো দেশে গৃহযুদ্ধের কারণে টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় সংক্রমণ বেশি হয়। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে সফল টিকাদান কর্মসূচি চলেছে, সেখানে এই প্রাদুর্ভাব বড় ধরনের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন সহস্রাধিক নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর আসছে। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা এবং আক্রান্তদের সঠিক আইসোলেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই সংকট নিরসনে সরকারের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।