তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগ, নেপথ্যে কি ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্ব?
তুলসি গ্যাবার্ড
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন তুলসি গ্যাবার্ড। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগের কথা জানালেও তার এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক বিচ্ছেদকেই বড় করে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়ার কথা জানিয়ে জুনের শেষে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের পদ ছাড়ার কথা বলেছেন তুলসী গ্যাবার্ড।
ট্রাম্প গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেয়ার পর ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক কংগ্রেস সদস্য তুলসী গ্যাবার্ডকে এই পদে মনোনীত করেছিলেন।
পদত্যাগ করতে চান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লেখা চিঠিতে তুলসী গ্যাবার্ড বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, আমি অবশ্যই পদত্যাগপত্র জমা দেব। সেটি ৩০ জুন, ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে।’
তুলসী গ্যাবার্ড লিখেছেন, ‘আমার স্বামী আব্রাহামের সম্প্রতি অতি বিরল ধরনের বোন ক্যানসার ধরা পড়েছে। আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে সে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে চলেছে। এই সময়ে তার পাশে থাকা এবং এই লড়াইয়ে তাকে পূর্ণ সমর্থন দেয়ার জন্য আমার অবশ্যই সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।’
তুলসী গ্যাবার্ড পদত্যাগের চিঠিতে ব্যক্তিগত কারণের কথা লিখলেও ঘটনা সম্পর্কে অবগত হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র বলেছে, হোয়াইট হাউস তাকে চলে যেতে বাধ্য করেছে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বড় কংগ্রেসনাল শুনানিতে হাজির হন মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড। সেখানে তিনি দাবি করেন, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। একইসঙ্গে তিনি এটাও বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি ধসে পড়েনি। তবে বিতর্ক তৈরি হয় তার লিখিত ও মৌখিক বক্তব্যের পার্থক্য নিয়ে।
লিখিত সাক্ষ্যে গ্যাবার্ড স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তেহরান তা পুনর্গঠনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তবে প্রকাশ্য শুনানিতে সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশ উচ্চারণ করেননি তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, তুলসীর এই অবস্থান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছিল, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছিল এবং সেটিই ছিল হামলার প্রধান কারণ।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার শুনানিতে কটাক্ষ করে বলেন, গ্যাবার্ড সেই অংশই বাদ দিয়েছেন যা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর সেখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে গোয়েন্দা মূল্যায়ন আর রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর ফাটল।
পরিস্থিতি আরও নাটকীয় রূপ নেয় মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্টের পদত্যাগের পর। পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো অনিবার্য হুমকি ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্টের এই অবস্থান প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে সামনে নিয়ে আসে। আর গ্যাবার্ডও তাকে প্রকাশ্যে আক্রমণ না করে অনেকটা একই ধরনের সংযত অবস্থান ধরে রাখেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধপন্থি অংশের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে পড়ে।
শুনানিতে গ্যাবার্ড আরও জানান, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক ছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের মূল্যায়ন ছিল, ইরান যেকোনো সময় এই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আগেভাগে পরিকল্পনা নেয় পেন্টাগন।
তবে আইনপ্রণেতাদের বড় প্রশ্ন ছিল যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আসলে কতটা প্রভাব রাখতে পেরেছিলেন? অনেকের অভিযোগ, গোয়েন্দা তথ্যের চেয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই তখন বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। তাই স্বামীর চিকিৎসাকে সামনে রেখে গ্যাবার্ডের পদত্যাগের সরকারি ব্যাখ্যা বাস্তব হলেও, এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক চাপ ও নীতিগত দ্বন্দ্ব কাজ করেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।