হজের খুতবায় উঠে এল জালিম শাসকদের পরিণতি আর মুসলিমদের ঐক্যের ডাক
সংগৃহীত
এবারের হজের খুতবায় উঠে এলো এক গভীর বার্তা- ইতিহাসে যারা জুলুম করেছে, আল্লাহ তাদের কীভাবে ধ্বংস করেছেন, সেই শিক্ষা যেন আমরা ভুলে না যাই।
মঙ্গলবার আরাফাতের পবিত্র ময়দানে হজের খুতবা দেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। তিনি বলেন, এই দুনিয়ায় আল্লাহর কিছু চিরন্তন নিয়ম আছে, যেগুলো কখনো বদলায় না। একজন মুমিনের কাজ হলো এই নিয়মগুলোর ওপর বিশ্বাস রাখা এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া।
সুরা আল-হজ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহ সত্যিকারের মুমিনদের রক্ষা করেন। বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞদের তিনি পছন্দ করেন না। আল্লাহ নিজেই বলেছেন- অনেক জনপদকে তিনি সময় দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা যখন জুলুম করেই চলল, তখন তাদের শাস্তি দেওয়া হলো। আর শেষ পর্যন্ত সবাইকে তার কাছেই ফিরে যেতে হবে। যে আল্লাহর দ্বীনকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকেও সাহায্য করেন; কারণ আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
খুতবায় মুসলমানদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করা হয়। খতিব বলেন, ‘হে আল্লাহ, মুসলমানদের অবস্থা ভালো করে দিন। তাদের সত্যের পথে এক করুন। তাদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি জীবন সুন্দর করে দিন।’
সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের জন্যও দোয়া করা হয় খুতবায়। বলা হয়, তারা হাজিদের ইবাদত সহজ করেছেন, দুই পবিত্র মসজিদের সেবায় উদার হাতে খরচ করেছেন। আল্লাহ যেন তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দেন।
হাজিদের জন্যও বিশেষ দোয়া করা হয়, আল্লাহ যেন তাদের হজ কবুল করেন, গুনাহ মাফ করেন এবং সুস্থ ও নিরাপদে বাড়ি ফেরার তওফিক দেন।
সেদিন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানে ছিলেন হাজিরা। সেখানে তারা খুতবা শুনলেন, জোহর ও আসরের নামাজ পড়েন। আরাফাতে অবস্থান করাটাই হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা ১৫ লাখের বেশি মুসলমান সেদিন একসাথে জমায়েত হয়েছিলেন সেই পবিত্র মাঠে। সবার মুখে তখন একটাই ধ্বনি- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ, আমি হাজির। তোমার কোনো শরিক নেই। সব প্রশংসা ও ক্ষমতা শুধু তোমার।’ এই তালবিয়ার ধ্বনিতে কেঁপে উঠেছিল বিদায় হজের সেই ঐতিহাসিক মাঠ।
খুতবায় আরও বলা হয়েছে, তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস রাখা, তাকওয়া অর্জন করা, তাকদিরে আস্থা রাখা এবং বিপদে ধৈর্য ধরাই হলো মুমিনের আসল পরিচয়।
কেয়ামতের ব্যাপারেও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় আল্লাহই একমাত্র সত্য, তিনিই মৃতদের পুনরায় জীবিত করবেন, কিয়ামত অবশ্যই আসবে, কোনো সন্দেহ নেই।
হজের বিশেষ দিকটাও তুলে ধরা হয় খুতবায়। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ এখানে ভাষা, বর্ণ ও দেশের পার্থক্য ভুলে একসাথে আল্লাহর ইবাদত করেন। এই ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব আর সহমর্মিতাই হজের অন্যতম বড় শিক্ষা।
হজের সময়গুলোতে বেশি বেশি দোয়া করার পরামর্শও দেওয়া হয় কারণ এই জায়গাগুলো দোয়া কবুলের বিশেষ স্থান। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।’
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ হলো পঞ্চম। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। কাবাঘর তাওয়াফ, আরাফাতে অবস্থান, সাফা-মারওয়া সাঈ, মিনায় পাথর নিক্ষেপ, কোরবানি প্রতিটি কাজের পেছনে রয়েছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর গভীর আনুগত্য এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের ইতিহাস।