চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পথে অগ্রগতির তথ্য জানাল নাসা

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির পথে অগ্রগতির তথ্য জানাল নাসা

ছবি: সংগৃহীত

চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করার প্রকল্প ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল অ্যারোনেটিক্স অ্যান্ড স্পেস এজেন্সি (নাসা)। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে প্রকল্পে অগ্রগতির তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবারের বিবৃতিতে চাঁদে প্রস্তাবিত স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির জন্য রোবটচালিত যেসব যন্ত্রপাতি ও ড্রোন ব্যবহার করা হবে, সেসবের ছবি ও বিবরণ প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর নাম প্রকাশ করেছে নাসা। এসব কোম্পানির মধ্যে মার্কিন ধনকুবের এবং বিশ্বের বৃহত্তম ই-কমার্স সাইট অ্যামাজন ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের মালিকানাধীন ব্লু অরিজিনের নামও আছে।

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করতে গত মার্চে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছিল নাসা। সেই ঘোষণায় বলা হয়েছিল, আগামী ২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরু এলাকায় একটি পারমাণবিক ও সৌরশক্তি চালিত ঘাঁটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা।

নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “নতুন এই পরিকল্পনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো চাঁদ হারাবে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারলে সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো, মূল্যবান খনিজ সম্পদ আহরণ এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে যাত্রা আরও সহজ হবে।

তবে এই লক্ষ্য অর্জনে নাসার সামনে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে চীন। চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটি তাদের শেনঝৌ-২৩ মহাকাশযান উৎক্ষেপণ করে নভোচারীদের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে পাঠিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালে। মঙ্গলবার যে বিবৃতি দিয়েছে নাসা, তাতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিদায়ের আগেই চাঁদে ফের মার্কিনিদের পাঠাতে চায় নাসা।

তিন ধাপে এগোবে নাসার পরিকল্পনা
নাসার ‘ইগনিশন মুন বেস’ কর্মসূচি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে মানুষ পাঠানোর আগে চাঁদের দুর্গম এলাকা অনুসন্ধান ও মানচিত্র তৈরির জন্য পাঠানো হবে রোবোটিক ল্যান্ডার ও বিশেষ ড্রোন। এছাড়া এমন যানবাহন পাঠানো হবে, যেগুলো ভবিষ্যতে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে চলাচল এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বহনে সহায়তা করবে।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই রোবোটিক অনুসন্ধান চলবে। এ সময়ে ২৫টি উৎক্ষেপণের মাধ্যমে প্রায় ৪ মেট্রিক টন সরঞ্জাম চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কোন কোম্পানি কী বানাচ্ছে?
ব্লু অরিজিন তৈরি করছে ‘এন্ডিউরেন্স’ নামের একটি লুনার ল্যান্ডার। এটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অবতরণ করতে পারবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করবে।

অন্যদিকে অ্যাস্ট্রোবোটিকের ‘গ্রিফিন-১’ ল্যান্ডারকে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে অবস্থিত নোবিলে ক্রেটারে অবতরণের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।

এসব যানে থাকবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং লেজারের প্রতিফলিত আলো ব্যবহার করে অবতরণে সহায়ক আধুনিক প্রযুক্তি।

চাঁদে বিদ্যুৎ ও বসবাসের পরিকল্পনা
পরবর্তী ধাপে নাসা চাঁদে সৌরবিদ্যুৎ ও পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র নির্মাণ করতে চায়। এর মধ্যে থাকবে ফিশন রিয়্যাক্টরও। ২০৩২ সালের মধ্যে নভোচারীদের জন্য ‘আধা-স্থায়ী’ আবাসন নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ রোভার যান নভোচারীদের দীর্ঘ দূরত্বে চলাচলে সহায়তা করবে।

চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ সেখানে বরফ আকারে জমে থাকা পানির অস্তিত্ব রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এই পানি ভবিষ্যতে পানীয় জল, অক্সিজেন এবং জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

চাঁদে প্রথম মানুষের পদচিহ্ন পড়ে ১৯৬৯ সালে। সে বছর নাসার অ্যাপোলো ১১ নামের মহাকাশ যানে চেপে চাঁদে গিয়েছিলেন ৩ মার্কিন নভোচারী— নীল আর্মস্ট্রং, অ্যাডউইন অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স।

তারপর ১৯৭২ সালে নাসার মহাকাশ যান অ্যাপোলো ১৭- তে চেপে চাঁদে যান আরও ৩ মার্কিন নভোচারী— ইউজিন সারনান, হ্যারিসন স্মিথ এবং রন এভান্স।

এরপর আর কোনো নভোচারীকে চাঁদে পাঠায়নি নাসা। সূত্র : বিবিসি