কোরবানি বাদ পড়লে শুধু তাওবাই কি যথেষ্ট?
ফাইল ফটো
কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর এটি ওয়াজিব হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদায় করা জরুরি। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে- কোনো কারণে ওয়াজিব কোরবানি বাদ পড়ে গেলে শুধু তাওবা করলেই কি দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়?
ওয়াজিব কোরবানি বাদ পড়লে করণীয়
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে, যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল কিন্তু নির্ধারিত সময় (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) পার হয়ে গেছে এবং তিনি কোরবানি করেননি, তার দায়িত্ব শুধু তাওবা করলেই শেষ হয় না। কোরবানি একটি ওয়াজিব ইবাদত। তাই তা আদায় না হলে শরিয়তের দৃষ্টিতে দায়বদ্ধতা থেকে যায়।
ফিকহবিদদের মতে, এমন ব্যক্তির ওপর তাওবার পাশাপাশি আর্থিক দায়ও থেকে যায়। পশু কেনা না হলে একটি কোরবানিযোগ্য পশুর মূল্য সদকা করা আবশ্যক। আর পশু কেনা হলেও সময়ের মধ্যে জবাই না হলে সেই পশুটি জীবিত অবস্থায় সদকা করে দিতে হবে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর জবাই করলে পুরো গোশত সদকা করা ওয়াজিব। এ ক্ষেত্রে নিজে খাওয়া বা ধনী ব্যক্তিকে খাওয়ানো জায়েজ নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০২, ২০৪; ফতোয়ায়ে কাজিখান: ৩/৩৪৫; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩২০)
রাসুলুল্লাহ (স.) সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন- ‘যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩; মুসনাদে আহমদ: ৮২৭৩)
তাওবা কি যথেষ্ট?
শুধু তাওবা করলে গুনাহ মাফ হওয়ার আশা করা যায়, তবে শরিয়তের আর্থিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না। আলেমদের মতে, তাওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত জরুরি- পূর্বের ভুলের জন্য অনুতাপ, ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প এবং ক্ষতিপূরণযোগ্য ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ আদায়। কোরবানির মতো আর্থিক ইবাদতের ক্ষেত্রে তাওবার পাশাপাশি শরিয়ত নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ আদায় করাও জরুরি।
বিগত বছরগুলোতে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকা সত্ত্বেও যারা এ বিধান না জেনে কোরবানি করেননি, তাদের প্রতি বছরের জন্য একটি কোরবানিযোগ্য পশুর সমমূল্য সদকা করতে হবে। (অন্তত একবছর বয়সী একটি ছাগলের সমমূল্য)। (ফতোয়ায়ে শামি: ৯/৪৫৩; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৫)
নারীদের কোরবানি: একটি উপেক্ষিত বিধান
সমাজে অনেক নারীর ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও তারা এ বিষয়ে সচেতন নন। অনেকে মনে করেন স্বামীর কোরবানিই তাদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বামী ও স্ত্রীর মালিকানা ও হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা।
স্ত্রীর কাছে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার সমমূল্যের স্বর্ণ বা অলঙ্কার থাকে, তবে তার ওপর স্বতন্ত্রভাবে কোরবানি ওয়াজিব। স্বামীর কোরবানি স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় হয় না- যদি না স্বামী স্ত্রীর সম্মতিতে তার পক্ষ থেকে আলাদা পশু বা ভাগ কোরবানি করেন। বিগত বছরগুলোতে এই বিধান না জেনে যারা কোরবানি করেননি, তাদের প্রতি বছরের জন্য একটি করে ছাগলের মূল্য সদকা করা জরুরি। (ফতোয়ায়ে শামি: ৯/৪৫৩; আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩১৫)
আলেমরা বলেন, পারিবারিক পর্যায়ে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে কেউ অজান্তে ওয়াজিব ইবাদত থেকে বঞ্চিত না হন।
সমাধান ও করণীয়
যাদের ওয়াজিব কোরবানি বাদ পড়ে গেছে, তাদের প্রথম কাজ হলো আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে তাওবা করা। এরপর পশু কেনা না হলে একটি কোরবানিযোগ্য পশুর মূল্য সদকা করতে হবে। পশু কেনা হলে সেটি জীবিত সদকা করে দিতে হবে। একাধিক বছর বাদ পড়লে প্রতি বছরের হিসেবে আলাদাভাবে সদকা করতে হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কোরবানি একটি মহান ইবাদত, যা তাওহিদ, আনুগত্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক। ওয়াজিব কোরবানি সময়মতো আদায় করা যেমন জরুরি, তেমনি বাদ পড়ে গেলে শুধু তাওবা নয়, শরিয়তের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ আদায় করাও আবশ্যক। সচেতনতা ও সঠিক জ্ঞানের অভাবে যেন কেউ এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত থেকে বঞ্চিত না হন- এটাই মুসলিম সমাজের জন্য বড় শিক্ষা।