নবায়নযোগ্য জ্বালানির কর ১ শতাংশে নামানোর দাবি

নবায়নযোগ্য জ্বালানির কর ১ শতাংশে নামানোর দাবি

ছবি: সংগৃহীত

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সৌর ও বায়ুশক্তিভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, উচ্চ কর-শুল্ক, নীতিগত বৈপরীত্য এবং অর্থায়নের অভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না। তাই আগামী ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর কর-শুল্ক প্রতীকী এক শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য উৎস: চাই বাজেটের নীতিগত পরিবর্তন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।

সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই), ল-ইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

বক্তারা বলেন, বর্তমানে জলবিদ্যুৎসহ দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট। অথচ সৌর ও বায়ুশক্তি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এত বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর ২৭ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা খাতটির বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর বর্তমানে প্রায় ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ কর আরোপিত হলেও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সুবিধা অব্যাহত রয়েছে। ফলে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অথচ এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় জাতীয় রাজস্বের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশেরও কম।

বক্তারা আরও বলেন, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে এবং ১ হাজার ১৮০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সক্ষম। একইভাবে প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩১ হাজার টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে।

আসন্ন জাতীয় বাজেটের জন্য পাঁচ দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে আগামী ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর সব ধরনের কর-শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়ে আনা, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠন, আবাসিক ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকি, কর্পোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (সিপিপিএ) চালু এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ।

এ ছাড়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বৃহৎ ভূমিনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (এগ্রিভোল্টাইক) এবং জলাশয়ভিত্তিক ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা অব্যাহত রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উপেক্ষা করলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আমদানি নির্ভরতার দীর্ঘস্থায়ী চক্রে আটকে পড়বে।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অপরিহার্য। তাই সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ সহজ করতে কর-শুল্ক কমানো প্রয়োজন।

লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান দূর করতে বাজেটে শক্তিশালী নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই নির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

বক্তারা সতর্ক করে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য নীতিগত ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতা দূর না হলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য আরও বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তীব্র হবে এবং জাতীয় অর্থনীতি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকিতে থাকবে। বিপরীতে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে জ্বালানি আমদানি কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সহজ হবে।