গুজব থেকে রক্ষা পেতে মেনে চলুন ৬ নির্দেশনা
ছবি: সংগৃহীত
ডিজিটাল যুগে ভুয়া খবর বা ফেক নিউজ আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে আচ্ছন্ন ও বিকৃত করে তুলছে। যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়ানোর কারণে তুচ্ছ তর্ক-বিতর্ক থেকে শুরু করে প্রাণহানির মতো ভয়াবহ ঘটনা আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। একজন মুসলিম হিসেবে প্রতিদিনের একটি বড় সময় ডিজিটাল মাধ্যমে কাটানোর সময় ভুয়া খবর সম্পর্কে সচেতন থাকতে আমাদের কী কী জানা অত্যন্ত জরুরি, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভুয়া খবর কোনো নতুন বিষয় নয়
বানোয়াট খবর ও গুজব ছড়ানোর এই প্রবণতা ইসলামী ইতিহাসের সূচনা লগ্ন থেকেই চলে আসছে। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরে স্বয়ং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং তার পরিবার কীভাবে ভুয়া খবরের শিকার হয়েছিলেন, তা বর্ণনা করা হয়েছে। সেই দুঃখজনক ঘটনায় মহানবী (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে রাসূলের এক সাহাবি হজরত সাফওয়ান (রা.)-এর সঙ্গে জড়িয়ে মিথ্যা অপবাদ ছড়ানো হয়েছিল। এই অপপ্রচারের ফলে রাসূলের পরিবার ও আয়েশার পিতামাতার মধ্যে প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি হয়, যা মহানবী (সা.)-কে ভীষণভাবে ব্যথিত করেছিল। দীর্ঘ এক মাস পর আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ও তাকে নির্দোষ প্রমাণ করে ওহী নাজিল হলে এই দুঃসহ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
সূরা আন-নূরের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা যখন এটি শুনলে, তখন মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা কেন নিজেদের লোকদের সম্পর্কে ভালো ধারণা করলে না এবং বললে না যে, এটি তো এক স্পষ্ট অপবাদ?
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটে অপতথ্যের ছড়াছড়ির কারণে ফেক নিউজ শব্দটি আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক, এক্স ও হোয়াটসঅ্যাপ আমাদের যোগাযোগের ধরণ পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তথ্যের এই মহাসমুদ্রে কোনটা আমাদের জন্য ইতিবাচক আর কোনটা ক্ষতিকর, তা চেনা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২. মনোযোগ হীনতা থেকে ভূয়া খবরের সূত্রপাত
প্রতিদিন আমাদের সামনে এত বেশি তথ্য আসে যে, আমরা সাধারণত কোনো লেখার গভীরে না গিয়ে ওপর ওপর চোখ বুলিয়ে যাই। ভুয়া খবর তৈরির কারিগররা মানুষের এই অভ্যাসের সুযোগ নেয়। তারা খবরগুলোকে এমন চটকদার ও আকর্ষণীয় শিরোনাম দিয়ে সাজায়, যার ভেতরে পবিত্র কোরআনের আয়াত, হাদিসের অংশ কিংবা কোনো ধর্মীয় স্কলারের উক্তি জুড়ে দিয়ে সেটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করা হয়। যখনই আমরা আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় এমন কিছু দেখি, তখনই যাচাই না করে তা বিশ্বাস করে বসি এবং ঝোঁকের মাথায় সেটি অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করি।
মনে রাখবেন, কোনো খবরের শিরোনাম যদি সবগুলো বড় হাতের অক্ষরে লেখা হয় এবং অহেতুক অনেকগুলো বিস্ময়সূচক বা প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, তবে বুঝবেন সেটি শুধু আপনার আবেগকে উসকে দেওয়ার জন্য করা হয়েছে। কোনো বিষয়ে সন্দেহ হলে অভিজ্ঞ কারো পরামর্শ নিন।
৩. নিশ্চিত না হয়ে তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমাদের করণীয় সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যে তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই, তা বর্জন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-ইসরা-এর ৩৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে ছুটো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও হৃদয়—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কেই কেয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে।
ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে আমরা যা-ই পড়ি না কেন, তা যাচাই না করে ছড়ালে আল্লাহর কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। মিথ্যা বা ফিতনা ছড়ানোর উদ্দেশ্য না থাকলেও অসচেতনভাবে তথ্য শেয়ার করার কারণেও গুনাহ হতে পারে। তাই তথ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বশীল ও সতর্ক হতে হবে। নিশ্চিত না হলে সেটি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
৪. দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার পর ভুয়া খবর ছড়ানোর প্রবণতা বাড়ে
যেকোনো বড় দুর্ঘটনা বা দুর্যোগের সময় মানুষের মনে এক ধরনের শূন্যতা ও ব্যাকুলতা তৈরি হয়। ঘটনার প্রকৃত কারণ বা ধারাবাহিকতা তৎক্ষণাৎ জানা যায় না বলে মানুষের কৌতুহল থাকে তুঙ্গে। এই সময় সামনে আসা যেকোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও ক্লিপ আমাদের সেই কৌতুহল মেটাতে সাহায্য করে। তখন মানুষ মনে করে সে ঘটনাটি সম্পর্কে সবার আগে জেনে গেছে এবং অন্যকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনার তাড়না থেকে দ্রুত সেটি শেয়ার করতে শুরু করে। আর এই সুযোগেই ভুয়া তথ্যগুলো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্যোগের পর কোনো তথ্য পেলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই তথ্য কি আসলেই সত্যি? মূল ধারার গণমাধ্যমগুলোতে এই খবর এসেছে কি না, তা গুগলে সার্চ করে দেখে নিন। যদি দেশের নির্ভরযোগ্য কোনো পত্রিকায় খবরটি না থাকে, তবে ধরে নিতে পারেন এটি ভুয়া খবর।
৫. ইন্টারনেটের তথ্য গ্রহণে সতর্ক হোন
অনলাইনে যেকোনো তথ্য পড়ার সময় অন্ধভাবে বিশ্বাস করা যাবে না। অনির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ও ম্যাগাজিনগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় ডিজাইন ও ভিডিওর মাধ্যমে তাদের প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি করে। আমরা যদি সচেতন না থাকি, তবে অবচেতনভাবেই তাদের ভূয়া তথ্য আমাদের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে, যা আমাদের চিরন্তন মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দেয়।
৬. ফিতনা ছড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখুন
হুজুগে মেতে ইন্টারনেটে বানোয়াট তথ্য শেয়ার করার অর্থ হলো সমাজে ফিতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে আপনি অন্য মানুষকেও একটি মিথ্যা বিষয় বিশ্বাস করতে বাধ্য করছেন।
পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নূরের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন তোমরা মুখে মুখে তা ছড়াচ্ছিলে এবং নিজেদের মুখে এমন কথা উচ্চারণ করছিলে যার কোনো জ্ঞান তোমাদের ছিল না; আর তোমরা একে খুব তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব আমরা সবসময় সরাসরি দেখতে পাই না। শেয়ার বাটনে একটি ক্লিকের মাধ্যমে আমরা মনে করি কিছুই তো হয়নি, কিন্তু আমাদের এই একটি অসতর্ক শেয়ারের কারণে কারও জীবন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, এমনকি সমাজে বড় ধরনের দাঙ্গা বা প্রাণহানিও ঘটতে পারে। তাই শেয়ার করার আগে তথ্যের উৎস পরীক্ষা করুন এবং নির্ভরযোগ্য কি না তা নিশ্চিত হয়ে নিন।