যে কারনে মায়ের পরিচয় লুকিয়ে রাখেন কিম

যে কারনে মায়ের পরিচয় লুকিয়ে রাখেন কিম

ফাইল ছবি।

উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে রহস্যের শেষ নেই। তবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যটি সম্ভবত তার নিজের মাকে ঘিরেই। গত ১৫ বছরের শাসনামলে কিম জং উন একবারের জন্যও জনসমক্ষে নিজের মায়ের নাম মুখে নেননি। যে দেশে রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবারকে প্রায় ঈশ্বরের সমতুল্য ভাবা হয়, সেখানে তার মায়ের এই পরিচয় গোপন রাখার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বড় রাজনৈতিক সংকট।

‘পেকতু পর্বত’ ও পবিত্র বংশমর্যাদার মিথ

উত্তর কোরিয়ায় কিম পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতার মূল ভিত্তি হলো তাদের তথাকথিত ‘পেকতু পর্বতের রক্তধারা’। দেশটির সরকারি প্রচারণা অনুযায়ী, কোরীয় জাতির পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা ‘দানগুন’-এর পবিত্র জন্মস্থান এই পেকতু পর্বত।

কিম বংশের দাবি, উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং জাপানি ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সময় এই পাহাড়েই ঘাঁটি গেঁড়েছিলেন এবং তার ছেলে কিম জং ইলও এখানেই জন্মগ্রহণ করেন। যদিও ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ বলে, কিম জং ইলের জন্ম হয়েছিল রাশিয়ায়। সাবেক উত্তর কোরিয়ান কূটনীতিক রিউ হিউন-উ তার বইতে লিখেছেন, কোনো বড় সামরিক বা রাজনৈতিক অর্জন ছাড়াই কিম জং উন মাত্র ২০ বছর বয়সে ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন কেবল এই 'পেকতু রক্তধারা'র সুনামের কারণে।

কিন্তু কিমের মায়ের আসল পরিচয় সামনে এলে এই পবিত্র বংশমর্যাদার পুরো ভিত্তিটাই ধসে পড়বে।

মায়ের জাপানি কানেকশন ও ‘সংবুন’ প্রথা

কিম জং উনের মা ‘কো ইয়ং হুই’ জাপানের ওসাকা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের বাসিন্দা হলেও জাপানি ঔপনিবেশিক শাসনের সময় (১৯১০-১৯৪৫) তারা জাপানে চলে যায়। সেখানে তাদের ’জাইনিচি কোরিয়ান’ (জাপানে বসবাসকারী প্রবাসী কোরীয়) বলা হতো।

১৯৬০-এর দশকে ভালো জীবন ও নিখরচায় শিক্ষার প্রলোভনে প্রায় ৯৩,০০০ প্রবাসী কোরীয় উত্তর কোরিয়ায় ফিরে আসেন, যাদের মধ্যে ১০ বছর বয়সী কো-ও ছিলেন। শুরুতে তাদের স্বাগত জানানো হলেও, পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়ার কঠোর জাতিভেদ প্রথা বা ‘সংবুন’ ব্যবস্থায় তাদের ‘দোদুল্যমান বা সন্দেহভাজন শ্রেণি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। স্থানীয়ভাবে তাদের অবজ্ঞাসূচক ‘জ্যাপো’ নামে ডাকা হতো, যার অর্থ—বিদেশি ও বিপজ্জনক চিন্তাভাবনা দ্বারা দূষিত মানুষ।

গবেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার সমাজব্যবস্থায় একজন ‘নিচু শ্রেণীর প্রবাসী’ দেশের সর্বোচ্চ নেতার মা—এটা সাধারণ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।

এক অলিখিত উপাখ্যান ও ক্ষমতার অলিন্দে কিম

ভাগ্যচক্রে পিয়ংইয়ংয়ের ‘মানসুদে আর্ট ট্রুপ’-এর নর্তকী কো ইয়ং হুই-এর প্রেমে পড়েন তৎকালীন ভাবি নেতা কিম জং ইল। তবে উত্তর কোরিয়ার সমাজ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বা উপপত্নীর সন্তানদের নিচু চোখে দেখে। ফলে কিম জং ইলের আসল স্ত্রী রাজধানীতে থাকলেও, কো এবং তার তিন সন্তানকে পিয়ংইয়ং থেকে দূরে ওনসান শহরের এক গোপন প্রাসাদে রাখা হয়েছিল।

এমনকি উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুং কখনো কো-কে পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি দেননি এবং তার নাতি-নাতনিদের (যার মধ্যে কিম জং উনও ছিলেন) সাথে কখনো কোনো ছবি তোলেননি। ২০০৪ সালে প্যারিসের একটি হাসপাতালে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কো মারা গেলেও উত্তর কোরিয়ার গণমাধ্যমে তা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হয়।

তাহলে কিম জং উন কীভাবে উত্তরাধিকারী হলেন?

কিম জং ইলের আসল স্ত্রীর কোনো ছেলে ছিল না। অন্য এক উপপত্নীর বড় ছেলে ‘কিম জং নাম’ পশ্চিমা ঘেঁষা জীবনযাপনের কারণে বাবার মন থেকে ছিটকে যান (পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় তাঁকে বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়)। মেজো ভাই ‘কিম জং চুল’ তীব্র আফিম আসক্তির কারণে বাদ পড়েন। ফলে জেদি ও নেতৃত্ব গুণের কারণে ছোট ছেলে কিম জং উনই ২০১১ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে ক্ষমতা দখল করেন।

কেন এই চরম গোপনীয়তা?

মায়ের এই বিতর্কিত সামাজিক পরিচয়ের কারণেই আজ পর্যন্ত কিম জং উনের সঠিক জন্মদিনকে উত্তর কোরিয়ায় জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। কারণ তার জন্ম নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে মায়ের ইতিহাস সামনে চলে আসার ঝুঁকি থাকে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, মায়ের বংশমর্যাদার এই ‘ঘাটতি’ ঢাকতেই কিম জং উন তার স্ত্রী রি সোল জু এবং মেয়ে জু এ-কে খুব দ্রুত দুনিয়ার সামনে নিয়ে এসেছেন। তার স্ত্রী রি সোল জু পিয়ংইয়ংয়ের এক উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান এবং নামকরা সংগীতশিল্পী ছিলেন, অর্থাৎ তার ‘সংবুন’ বা বংশমর্যাদা প্রশ্নাতীত।

উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি দেশটির সাধারণ মানুষ জানতে পারে যে তাদের ‘পবিত্র পেকতু বংশের’ সর্বোচ্চ নেতার মা আসলে জাপান থেকে আসা একজন সাধারণ ‘জ্যাপো’ বা নিচু শ্রেণীর প্রবাসী ছিলেন, তবে তা কিম বংশের বৈধতাকে গুঁড়িয়ে দেবে। আর এই সত্যটি উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য একটি পারমাণবিক বোমার মতোই বিপজ্জনক।