আট বছর পর সচল হচ্ছে বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প

আট বছর পর সচল হচ্ছে বগুড়া–সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্প

সংগৃহীত ছবি

অবশেষে আট বছর পর বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মান প্রকল্পের কাজে গতি ফিরছে। ফলে উত্তরাঞ্চলবাসীর দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। খুব শীঘ্রই শুরু হবে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া রেলপথ নির্মাণ কাজ। জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রমে এসেছে বড় অগ্রগতি। শেষ হয়েছে ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে ছাড় হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। জমির মালিকদের মাঝে চেক বিতরণ শেষ পর্যায়ে। 

সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া এই নতুন রেলপথ উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনবে যুগান্তকারী পরিবর্তন। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এটি হবে আরেকটি মাইলফলক। এই রেলপথ শুধু দুটি জেলার সংযোগই তৈরি করছে না। বরং গোটা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতে আনবে নতুন দিগন্ত। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা কখন হুইসিল বাজবে ট্রেনের।

বগুড়া জেলা প্রশাসন বলছে, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরুণের টাকা বিতরণ শেষ পর্যায়ে।

জানা যায়, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আলোচনা নতুন নয়। যমুনা সেতু চালুর পর থেকেই উত্তরাঞ্চলের সাথে ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, রুট নির্বাচন এবং কারিগরি বিশ্লেষণ করা হলেও প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ফাইলে বন্দি ছিল। 

২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো সংযোজন এবং মূল্যস্ফীতির কারণে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়ে এখন প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার কারণে ভূমির মূল্য, নির্মাণসামগ্রীর দাম এবং প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদানের ব্যয় বেড়ে যায়। এতে সংশোধিত ব্যয় প্রায় দ্বিগুণে পৌঁছায়। প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতির চিত্র। বগুড়া অংশে মোট ৪৮১ দশমিক শূন্য ৯ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। 

ইতোমধ্যে বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। মাঠ জরিপ, ভিডিও ধারণ এবং মালিকানা যাচাই কাজও শেষ। গত ২২ জুন ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকার চেক বগুড়া জেলা প্রশাসকের হাতে এসেছে। এখন পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ কাজ চলছে।

প্রকল্পের আওতায় বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৮৬ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি লুপলাইন, নতুন স্টেশন, সেতু, কালভার্ট, সিগন্যালিং ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। 

বহুল প্রত্যাশিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের অপেক্ষায় এ অঞ্চলের মানুষ। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ঢাকায় যাতায়াতের প্রধান ভরসা হচ্ছে যমুনা সেতু হয়ে রেল ও সড়কপথ। কিন্তু অতিরিক্ত চাপ ও রুট জটিলতার কারণে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। নতুন এই রেলপথ সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া হয়ে উত্তরাঞ্চলের জেলা যেমন নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, দিনাজপুর এবং পঞ্চগড়ের সঙ্গে ঢাকা ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের দূরত্ব অনেক কমিয়ে আনবে। 

সরাসরি সিরাজগঞ্জ-বগুড়া ট্রেন চলাচল শুরু হলে ঢাকা-বগুড়া যাত্রায় সময় কমবে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘন্টা। কারণ বর্তমানে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের প্রকৃত দূরত্ব মাত্র ৭২ কিলোমিটার হওয়া সত্ত্বেও দুই জেলার মধ্যে সরাসরি কোন রেলপথ না থাকায় এই অঞ্চলের ট্রেনগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পাবনা, সান্তাহার, নাটোর ও ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। এতে ঢাকা থেকে বগুড়া পৌছাতে বর্তমানে ট্রেনে সময় লাগে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘন্টা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের দূরত্ব ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে।

বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরুণের টাকা বিতরণ শেষ পর্যায়ে। রেল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণ করতে চাইলে যে কোন সময় জমি বুঝিয়ে দেওয়া যাবে। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মান হলে উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির বড় পবির্তন আসবে।