চট্টগ্রামে বন্যায় বিপুল বসতবাড়ি বিলীন, ২৯৭ কি.মি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত

চট্টগ্রামে বন্যায় বিপুল বসতবাড়ি বিলীন, ২৯৭ কি.মি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত

ফাইল ছবি

 

চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাত কমার সাথে সাথে বন্যার পানিও কমে আসছে। গত দুইদিনে পাহাড়ি ঢল এবং সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানির স্তর কমার সাথে সাথে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়ায় পানি অন্তত ৩-৪ ফুট পর্যন্ত নেমে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত অনেক এলাকায় বাড়িঘর, আঞ্চলিক সড়কগুলো ২-৮ ফুট পর্যন্ত পানির নিচে ডুবে আছে। ফলে যারা আশ্রয়কেন্দ্র অথবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা চাইলেও বাড়ি যেতে পারছেন না। এখনো পানিবন্দী আছেন ৫ লাখ মানুষ। ফলে দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না তাদের

জানা গেছে, বন্যায় বসতবাড়ি, আসবাবপত্র ছাড়াও, রাস্তাঘাট, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিলেও সার্বিক চিত্র জানতে আরও অন্তত ২-৩ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা। এছাড়া বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছে। এখনো বিশুদ্ধ পানি ও রান্না করা খাবারের সংকটও কাটেনি।

বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহেদ এমরান শহীদ সোমবার বিকালে বলেন, ‘ইউনিয়নের বাসিন্দা ৪২ হাজার। বৃহত্তর ইলশা, রত্নপুর, চাপাছড়িসহ অধিকাংশ গ্রামের মানুষ মাটির ঘরে বাস করেন। প্রায় সবারই ঘর ভেঙে গেছে। অবশিষ্ট মাটির ঘরগুলোও পানিতে ডুবে থাকার কারণে ভাঙ্গার উপক্রম। গ্রামে যেসব পাকাবাড়ি আছে বাসিন্দারা এখনো সেখানে আশ্রয়ে আছেন। এখনো জরুরি প্রয়োজনে নৌকা অথবা সাঁতরে যোগাযোগ রক্ষা করতে হচ্ছে।’

ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় মাটির ঘর অধ্যুষিত। সেখানকার বেশিরভাগ ঘরই ভেঙে গেছে, অথবা থাকার অনুপযোগী। তবে সড়কের উপরে এখনো পানি থাকায় এখনো ক্ষয়ক্ষতির তালিকা করা যাচ্ছে না। আপাতত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হচ্ছে। পানি পুরোপুরি কমলে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের তালিকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি সড়ক, কৃষি, মৎস্য বিভাগও ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করছে।’

বন্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মরত জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলার চিত্র এখনো অপরিবর্তিত। তবে বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি, সন্দ্বীপসহ বাকি উপজেলাগুলোর সার্বিক চিত্রে উন্নতি হয়েছে। তবে যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা এখনো আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান নিচ্ছেন। কিছু এলাকার বাসিন্দারা বাড়ি ফিরলেও ঘরের ভেতরে কাদামাটি পরিষ্কার, ঘর মেরামতের চেষ্টা করছেন। টানা পানির নিচে থাকায় মাটির চুলা ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে এখনো খাদ্য সংকটসহ বিভিন্ন দুর্ভোগ কাটছে না।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, পানি কিছুটা কমায় কেউ কেউ ঘরে ফিরছেন। তবে এখনো বন্যা পরবর্তী দুর্ভোগে আছেন বন্যার্তরা। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির পাশাপাশি রান্না করা খাবার, চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম চলমান থাকবে।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, পূর্ণাঙ্গ তালিকা পেতে আরও সময় দরকার। তবে প্রাথমিক হিসেবে মৎস্য বিভাগের ১০৯ কোটি ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর-দীঘি ও ৩২০টি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫১ কোটি টাকার বেশি। এছাড়াও সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, আনোয়ারা উপজেলায়ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক আপ্রু মারমা জানান, বন্যায় চট্টগ্রামের ১৬ উপজেলায় ১৪ হাজার তিন’শ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া সবজি, পানের বরজের ক্ষতি হয়েছে ২৫৯৪ দশমিক ১৭ হেক্টর জমির।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। ৩১টি গরু, ৮৭টি ছাগল, ৪০টি ভেড়া ও ৮৭ হাজার ৩৯৫টি মুরগি এবং এক হাজার হাঁস মারা গেছে। পানি নেমে এলে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যাবে।

সড়ক বিভাগ জানিয়েছে, বন্যার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার আঞ্চলিক সড়কগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাগুলো।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যা শেষ হলে পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। বিশেষ করে-স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণে সহযোগিতা, কৃষক ও মৎস্য চাষিদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামত কার্যকর পরিকল্পনা দ্রুত গ্রহণ করা উচিত।