সন্তানকে কতটুকু শাসন করা জায়েজ?
ফাইল ছবি
সন্তান মহান আল্লাহর দেওয়া এক অমূল্য নেয়ামত ও আমানত। তাদের সঠিক পরিবেশে, দ্বীনি আদর্শ ও উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে সন্তান প্রতিপালনের মূল ভিত্তি হলো ‘তারবিয়াত’ অর্থাৎ ভালোবাসা, শিক্ষা, আদর্শ ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে সন্তানকে ধীরে ধীরে উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলা।
তবে বর্তমান সময়ে সন্তান লালন-পালনে অভিভাবকরা প্রায়ই দুটি বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকেন; কেউ অতিরিক্ত স্নেহে সন্তানকে শাসনের বাইরে রাখেন, আবার কেউ শাসনের নামে কঠোরতা বা শারীরিক নির্যাতনের পথ বেছে নেন। ইসলাম এ দুই চরমপন্থার বিপরীতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনদর্শনের শিক্ষা দেয়।
তারবিয়াত: সন্তান প্রতিপালনের মূল ভিত্তি
ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তান প্রতিপালন আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার বিষয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর।’ (সুরা তাহরিম: ৬) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেন, পরিবারকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া এবং আদর্শ চরিত্রের ওপর গড়ে তোলাই হলো জাহান্নাম থেকে রক্ষার অন্যতম উপায়।
শাসন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে সন্তানকে সংশোধনের জন্য শাসনের সুযোগ থাকলেও তার লক্ষ্য হতে হবে ইতিবাচক ও সংশোধনমূলক। শাসনের চেয়েও ইসলাম প্রশিক্ষণ ও অভ্যাস গঠনের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। নবী করিম (স.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস এ বিষয়ে আলোকবর্তিকা- ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও। আর দশ বছর বয়সে (ইচ্ছাকৃত অবহেলা করলে) তাদের এ বিষয়ে শাসন করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৫)
এই হাদিস থেকে পরিষ্কার হয় যে, শাসনের বিধান দেওয়ার আগে দীর্ঘ সময় ধরে শিশুকে ভালোবাসা ও ধৈর্যের সঙ্গে ইবাদতে অভ্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ শাস্তির চেয়ে শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনেক বেশি।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আদর্শ: মমতার মূর্ত প্রতীক
বিশ্বনবী (স.) ছিলেন শিশুদের প্রতি অসীম মমতার আধার। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) কখনো কোনো খাদেম বা নারীকে প্রহার করেননি এবং আল্লাহর পথে জিহাদ ছাড়া কাউকে নিজের হাতে আঘাত করেননি।’ (সহিহ মুসলিম: ২৩২৮) শিশুদের প্রতি তাঁর কোমল আচরণ ও হাসিমুখে সালাম বিনিময় প্রমাণ করে যে, শিশুদের চরিত্র গঠনে ভয় দেখানোর চেয়ে স্নেহ ও সম্মানের পথ অনেক বেশি কার্যকর।
ইসলামি আইনজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, সন্তান বা শিক্ষার্থীকে সংশোধনের সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো উত্তম আচরণ, ধৈর্য, উৎসাহ ও ধারাবাহিক শিক্ষা। শাসনের প্রয়োজন দেখা দিলে সেটি যেন সর্বশেষ ব্যবস্থা হয় এবং তার উদ্দেশ্য থাকে শুধুই সংশোধন, কখনোই প্রতিশোধ বা রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়।
শাসনের সীমারেখা
ইসলাম সন্তান সংশোধনের ক্ষেত্রে শাসনের সুযোগ রাখলেও এর জন্য স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। শাসনের উদ্দেশ্য হবে সংশোধন ও কল্যাণ; রাগ, প্রতিশোধ বা অপমান নয়।
১. মুখমণ্ডলে আঘাত নিষিদ্ধ
রাসুলুল্লাহ (স.) মুখমণ্ডলে আঘাত করতে নিষেধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ৬৪১৮)
২. কোনো ধরনের ক্ষতি করা যাবে না
শাসনের নামে এমন আচরণ করা যাবে না, যাতে শিশুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন পড়ে, স্থায়ী ক্ষতি হয় বা তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ইসলামি আইনজ্ঞরা কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ ধরনের সীমালঙ্ঘন থেকে সতর্ক করেছেন।
৩. রাগের বশে শাসন নয়
রাগের মুহূর্তে সন্তানকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। কারণ তখন অনেক সময় সংশোধনের উদ্দেশ্যের পরিবর্তে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। রাসুলুল্লাহ (স.) রাগ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি: ৬১১৬)
৪. অপমান বা কটু আচরণ নয়
সন্তানকে গালিগালাজ করা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বা অন্যের সামনে অপমান করা ইসলামের উত্তম চরিত্রের পরিপন্থী। এ ধরনের আচরণ শিশুর আত্মমর্যাদা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তান ভুল করলে ইসলামের শিক্ষার আলোকে অভিভাবকের করণীয়
ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার আলোকে অভিভাবকরা সন্তানকে সংশোধনের জন্য নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে পারেন-
ভুল বুঝিয়ে বলা: প্রথমে অত্যন্ত আদরের সঙ্গে সন্তানকে তার ভুলটি বুঝিয়ে বলা এবং এর পরিণাম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
উৎসাহ ও পুরস্কার: ভালো কাজের জন্য প্রশংসা বা পুরস্কার দিয়ে তাকে সৎকাজের প্রতি আগ্রহী করে তোলা।
প্রিয় সুবিধা সীমিত করা: সরাসরি আঘাত না করে সাময়িকভাবে প্রিয় কোনো সুবিধা (যেমন: পছন্দের খেলা বা বিশেষ বস্তু) সীমিত করে তাকে সতর্ক করা।
প্রতীকী শাসন: যদি অন্যকোনো উপায়ে কাজ না হয়, তবে ১০ বছর বয়সের পর অত্যন্ত সংযতভাবে প্রতীকী শাসন করা যেতে পারে; সেটিও কেবল প্রয়োজন হলে এবং সংশোধনের উদ্দেশ্যে।
ভালোবাসা ও শিক্ষার ভারসাম্য
শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞদের অনেক পর্যবেক্ষণের সাথেও ইসলামের এই শিক্ষার মিল পাওয়া যায়। ভালোবাসা ও শাসনের মধ্যে ভারসাম্য থাকলে শিশু মানসিকভাবে দৃঢ় হয়। অতিরিক্ত কঠোরতা যেমন শিশুকে বিদ্রোহী করে তোলে, তেমনি অতিরিক্ত প্রশ্রয়ও তাকে বিপথগামী করতে পারে। মনে রাখতে হবে, সন্তানের হৃদয়ে ভয় নয়, বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তোলাই ইসলামি তারবিয়াতের মূল উদ্দেশ্য।
সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজন মহান আল্লাহর কাছে দোয়া, ব্যক্তিগত ধৈর্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। শাসনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাকে আল্লাহর অনুগত বান্দা ও একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। সন্তানের জীবন, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে পিতা-মাতার কাছে একটি আমানত। তাই এমন কোনো আচরণ করা উচিত নয়, যা তার শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির কারণ হয়।