বেঈমানির শাস্তি: কোরআন ও হাদিসে যা বলা হয়েছে

বেঈমানির শাস্তি: কোরআন ও হাদিসে যা বলা হয়েছে

ফাইল ছবি

পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বস্ততা হলো একটি সুস্থ সমাজ ও সম্পর্কের মেরুদণ্ড। পরিবার থেকে শুরু করে ব্যবসা, রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব সবকিছুর ভিত্তিই হলো এই পারস্পরিক বিশ্বাস। আর সেই আস্থার মূলে আঘাত করা বা বেঈমানি (খিয়ানত) করা ইসলামের দৃষ্টিতে এমন এক গুরুতর গুনাহ, যার ভয়াবহ পরিণতির কথা কোরআন ও সহিহ হাদিসে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
সাধারণত বিশ্বাসঘাতকতাকে আমরা কেবল বড় কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে চিন্তা করি। কিন্তু ইসলামে এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। কারও আমানতের খিয়ানত করা বা তার ন্যায্য অধিকার নষ্ট করাও বেঈমানির অন্তর্ভুক্ত।

১. বিশ্বাসঘাতককে পছন্দ করেন না আল্লাহ

পবিত্র কোরআনে বেঈমানি বা খিয়ানতকে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি কোনো বিশ্বাসঘাতক ও অকৃতজ্ঞকে ভালোবাসেন না।’ (সুরা হজ: ৩৮)
এ ছাড়া পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ আরও নির্দেশ দিয়েছেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে খেয়ানত করো না এবং জেনেশুনে নিজেদের আমানতেরও খেয়ানত করো না।’ (সুরা আনফাল: ২৭) প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়ে আল্লাহ বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা: ১) এসব আয়াত থেকে পরিষ্কার হয় যে, বেঈমানি আল্লাহর অত্যন্ত অপছন্দনীয় কাজ এবং এটি একজন মুমিনের আদর্শ চরিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

২. মুনাফিকির আলামত

বিশ্বাসঘাতকতা মানুষের চরিত্রে মুনাফিকির বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মুনাফিকের আলামত তিনটি- সে কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে তার খিয়ানত করে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘চারটি বৈশিষ্ট্য যার মধ্যে থাকবে, সে খাঁটি মুনাফিক। আর যার মধ্যে এর একটি থাকবে, তার মধ্যে মুনাফিকির একটি বৈশিষ্ট্য থাকবে- যতক্ষণ না সে তা ত্যাগ করে। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে খেয়ানত করে; কথা বললে মিথ্যা বলে; অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে; আর ঝগড়া করলে সীমালঙ্ঘন করে।’ (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম)

৩. প্রতারণাকারী নবীজির (স.) আদর্শভুক্ত নয়

ব্যবসায় পণ্যের ত্রুটি গোপন করা বা ওজনে কম দেওয়াও এক ধরনের খেয়ানত। একবার রাসুলুল্লাহ (স.) বাজারের এক বিক্রেতার খাদ্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে ভেতরের অংশ ভেজা পেলেন। তিনি তখন অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেছিলেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম) এটি বিশ্বাসঘাতকদের জন্য ইসলামের অত্যন্ত শক্তিশালী এক সতর্কবার্তা।

৪. কেয়ামতের দিন বেইমানদের প্রকাশ্য অপমান

পরকালে বিশ্বাসঘাতকদের জনসমক্ষে লজ্জিত করার জন্য বিশেষ চিহ্ন থাকবে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন প্রত্যেক বিশ্বাসঘাতকের জন্য (তার পিঠের কাছে) একটি পতাকা স্থাপন করা হবে এবং ঘোষণা করা হবে- এটি অমুক ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম) হাশরের ময়দানে কোটি কোটি মানুষের সামনে সেই দিনটি হবে খিয়ানতকারীদের জন্য চূড়ান্ত লাঞ্ছনার।

৫. যার বিপক্ষে স্বয়ং আল্লাহ বাদী হবেন

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিজেই বাদী হব। তাদের একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে আমার নামে অঙ্গীকার করে তা ভঙ্গ করেছে।’ (সহিহ বুখারি: ২২২৭)

বর্তমান সমাজে বেঈমানির রূপ

আজকের প্রেক্ষাপটে বেইমানি বা খিয়ানত নানা রূপে দেখা দিতে পারে। যেমন-

  • পেশাগত দায়িত্ব অবহেলা করা বা কর্মস্থলে ফাঁকি দেওয়া।
  • ব্যবসায় পণ্যের মান নিয়ে অসত্য তথ্য প্রদান।
  • কারও ব্যক্তিগত গোপন তথ্য (আমানত) অন্যের কাছে ফাঁস করা।
  • পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে আস্থার অমর্যাদা করা।
  • সামষ্টিক বা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার করা।

পরিত্রাণের পথ কী?

যদি কেউ অতীতে এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়ে থাকেন, তবে তাকে এখনই তওবা করতে হবে। প্রথমত, আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে ক্ষমা চাইতে হবে। দ্বিতীয়ত, যদি কারও সম্পদ বা অধিকার নষ্ট করা হয়, তবে তা দ্রুত ফিরিয়ে দিতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। কারণ মানুষের হক নষ্ট করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়, আর ইসলাম হক আদায়ের ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে।

বিশ্বাস অর্জন করতে দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু তা নষ্ট হতে একটি মুহূর্তই যথেষ্ট। তাই ইসলাম আমানতদারি, সততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকে একজন মুমিনের মৌলিক চরিত্র হিসেবে গড়ে তুলতে নির্দেশ দিয়েছে। দুনিয়ার সাময়িক লাভের জন্য বেইমানি হয়তো কিছু সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু আখেরাতে এর জবাবদিহি অত্যন্ত কঠিন। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত আমানত রক্ষা করা, প্রতিশ্রুতি পূরণ করা এবং সব অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলা।