সিকিমের তিস্তা টানেলে বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ২০, নিখোঁজ ৫

সিকিমের তিস্তা টানেলে বিস্ফোরণে নিহত বেড়ে ২০, নিখোঁজ ৫

ছবিঃ সংগৃহীত।

সিকিমের নামচি জেলার সমারডুং এলাকায় এনএইচপিসি-র তিস্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে বিস্ফোরণের জেরে ধস ও পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়া মিথেন গ্যাসর প্রভাবে এখনও পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে সিকিম প্রশাসন। বুধবার (২২ জুলাই) সকাল পর্যন্ত ১৩ জনের মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। বাকি ৭ জনের মরদেহ টানেলের বিভিন্ন অংশে শনাক্ত করেছে উদ্ধারকারী দল। এছাড়া টানেলের বিভিন্ন অংশে এখনও পাঁচজনের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।

শ্রমিকদের দুপুরের খাবারের বিরতির সময় মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এই ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে। প্রাথমিক সূত্রে জানা গেছে যে ঘটনার সময় টানেলের ভেতরে ২৭ জন শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। আকস্মিক ধস ও বিস্ফোরণের মুখে পড়ে দুজন কোনোক্রমে বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কাল বিলম্ব না করে উদ্ধারকাজ শুরু করে স্থানীয় জনগণ। এরপর উদ্ধারকাজে হাত লাগায় সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের বিপর্যয়ের মোকাবিলা বাহিনী। কেন্দ্রীয় বিপর্যয়ের মোকাবেলা বাহিনী। পরে মঙ্গলবার রাতে উদ্ধারকাজে যোগ দেয় ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের উদ্ধারকারী দল।

উদ্ধারকাজের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে আরও কঠিন বাস্তবতা। উদ্ধার অভিযানের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের সুপারিন্টেনডেন্ট অভিজিৎ কুন্ডু বলেন, এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, ওখান থেকে যাদের বের করে আনা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে। সেখানে আমি এবং আমার সহযোগীরা যা দেখতে পেয়েছি, ভেতরে প্রায় ৭-৮টি মরদেহ পড়ে রয়েছে। তাদের বেঁচে থাকার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে সেই জায়গা থেকে আমরা মরদেহগুলো বের করে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত ভেতরে আমরা জীবিত অবস্থায় কাউকে দেখতে পাইনি।

প্রথম প্রচেষ্টার পর পরবর্তী যে চেষ্টার জন্য আমরা যাব—ঈশ্বরের ইচ্ছা থাকলে হয়তো কেউ জীবিত মিলতেও পারেন, কিন্তু আপাতত জীবিত কাউকেই দেখা যায়নি। এখন এনডিআরএফ এবং কোল ইন্ডিয়ার উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে ভেতরে প্রবেশ করবে। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো ওই মরদেহগুলো বাইরে বের করে আনা। একবার, দুবার বা তিনবার চেষ্টার মাধ্যমে মরদেহগুলো বের করার পর আমরা পুরো টানেলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখব। এখনও পর্যন্ত সেভাবে ভালোভাবে দেখার সুযোগ হয়নি। প্রাথমিক কাজ শেষ করার পর আমরা যৌথভাবে উদ্ধার ও পুনরুদ্ধারের কাজ পরিচালনা করব।

ঘটনাস্থলে যান সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং ও রাজ্যপাল ওম প্রকাশ মাথুর। পুরো পরিস্থিতি ও উদ্ধার অভিযান খতিয়ে দেখেন তারা। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং বলেন, ভেতরে প্রায় ২৭ জন লোক ছিলেন। তার মধ্যে দুই জন ব্যক্তি কালকেই বাইরে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন এবং ২৫ জন ব্যক্তি ভেতরে আটকে পড়েন। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্য প্রশাসন, আমাদের সিকিম পুলিশ, এসডিআরএফ, এনডিআরএফ- সবাই মিলে উদ্ধারকাজে নামেন। এখন আমরা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখছি যে কোথায় কী খামতি রয়ে গেল, কী ধরনের গাফিলতি ছিল এবং আগামীতে আমাদের কী কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এরপর তদন্তের মাধ্যমে যদি দেখা যায় যে কোম্পানির কোনো গাফিলতি ছিল, তবে অবশ্যই কোম্পানি বা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর পাশাপাশি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে ৪ লাখ রুপি করে এবং যারা আহত হয়েছেন তাদের ৫০ হাজার রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে

উদ্ধারকাজ তদারকি করতে ইতোমধ্যেই দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা এবং উত্তরবঙ্গের আইজি সুকেশ জৈনসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা।

সবশেষ জানা গেছে, মৃত শ্রমিকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার বাসিন্দা অন্তত ৯ জন। তাদের প্রত্যেকেই ডুয়ার্সের কিলকট চা, ইন্দং চা বাগান ও নাগেশ্বরী চা বাগানের শ্রমিক ছিলেন। তাদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে জলপাইগুড়িতে।

আপাতত এই শ্রমিকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের অকুস্থলে আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে সব দৃশ্যমান মরদেহ এবং আটকে পড়া শ্রমিকদের সম্পূর্ণ উদ্ধার না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে যৌথ উদ্ধারকারী দলের তরফে জানানো হয়েছে।