দল থেকে বহিষ্কার হয়েও এমপি পদে বহাল ছিলেন যারা

দল থেকে বহিষ্কার হয়েও এমপি পদে বহাল ছিলেন যারা

ফাইল ছবি

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য (এমপি) পদ বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে, বাংলাদেশের সাংবিধানিক বিধান ও অতীতের নজির বলছে, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয় না।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬, ৬৭ ও ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার কারণগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব বিধানে দল থেকে বহিষ্কারকে সদস্যপদ বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে অতীতেও একাধিক সংসদ সদস্য দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও সংসদের পুরো মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন।

সর্বশেষ বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপরই তার সংসদ সদস্য পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সদস্যপদ শূন্য হবে। কিন্তু, দল যদি কাউকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে সদস্যপদ বাতিলের বিষয়ে সংবিধানে কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই।

অতীতের আলোচিত নজিরগুলোর মধ্যে রয়েছেন- পটুয়াখালী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হওয়ার পর দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও ২০১৪ সালে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন।

২০১৪ সালে নিউইয়র্কে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কৃত হন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। তবে, দলীয় বহিষ্কারের কারণে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি নিজেই স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলে তার আসন শূন্য হয়।

২০২১ সালে ফোনালাপ বিতর্কের পর তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগ থেকে অব্যাহতি পান ডা. মুরাদ হাসান। তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ না করায় একাদশ জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এ ছাড়া, ২০১৯ সালে গণফোরাম থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খানও পুরো সংসদীয় মেয়াদ সংসদ সদস্য  হিসেবে বহাল ছিলেন। একইভাবে অষ্টম জাতীয় সংসদে বিএনপির আবু হেনা ২০০৫ সালে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তৎকালীন স্পিকারের রুলিংয়ে তিনি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নবম সংসদে জাতীয় পার্টির এইচ এম গোলাম রেজাও বহিষ্কারের পর সদস্য পদ হারাননি।

সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র জমা দিলে তার আসন শূন্য হবে। একই অনুচ্ছেদে স্পিকারের অনুমতি ছাড়া পরপর ৯০ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থাকলেও সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে, ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের রায়ে নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দুই বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া, অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হওয়া, অব্যাহতি না পাওয়া দেউলিয়া হওয়া, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব হারানো বা বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ, লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকা কিংবা অন্য কোনো আইনের অধীনে অযোগ্য ঘোষিত হলেও সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হতে পারে।

সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হয়েছে কি না, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন বা বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়। কমিশন তদন্ত ও শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত দেয়।

সব মিলিয়ে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, শুধু দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না। ফলে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও তার সদস্যপদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সংবিধানের ব্যাখ্যা, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।