ঘুম ও হজমে ব্যাঘাত না ঘটাতে যেসব পানীয় এড়িয়ে চলবেন
সংগৃহীত ছবি
রাতের খাবারে আমরা কী খাচ্ছি, তার পাশাপাশি কী পান করছি সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের প্লেটের দিকে নজর দিলেও পানীয়ের ক্ষেত্রে অনেকেই অসচেতন থাকেন। অথচ সন্ধ্যাকালীন কিছু নির্দিষ্ট পানীয় হজমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, অ্যাসিডিটি বা বুক জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে, ঘুমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং এমনকি রক্তের শর্করাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সূর্যাস্তের পর মানবদেহ স্বাভাবিকভাবেই শিথিল হতে শুরু করে। তাই অতিরিক্ত চিনি, ক্যাফেইন, অ্যালকোহল কিংবা কার্বোনেটেড পানীয় পান করলে তা শরীরের এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। ফলে রাতে ঘুম আসতে সমস্যা হয় এবং পরদিন সকালে ক্লান্তি অনুভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাতের খাবারের সময় যেসব পানীয় এড়িয়ে চলা উচিত:
১. মিষ্টি কোমল পানীয়
এগুলোতে থাকে প্রচুর চিনি এবং ক্যালরি। রাতের খাবারের সঙ্গে এ জাতীয় পানীয় খেলে রক্তের শর্করা দ্রুত বেড়ে যায় এবং পরে হঠাৎ তা কমে যায়। ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকা ব্যক্তিদের জন্য এটি আরও ক্ষতিকর। এ ছাড়া এর কার্বোনেশন পেট ফাঁপা ও অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
২. এনার্জি ড্রিংকস
রাতের খাবারের সময় এনার্জি ড্রিংকস খাওয়া সবচেয়ে বাজে অভ্যাসের একটি। কারণ এতে প্রচুর ক্যাফেইন, চিনি ও উত্তেজক উপাদান থাকে। এর ফলে:
ঘুম আসতে দেরি হয়
হৃদস্পন্দন বাড়ে
অস্থিরতা তৈরি হয়
অনেকের ক্ষেত্রে অ্যাসিডিটির লক্ষণ দেখা দেয়
এমনকি সুগার-ফ্রি এনার্জি ড্রিংকসেও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর মতো পর্যাপ্ত ক্যাফেইন থাকে।
৩. কফি
খাবারের পর কফি খাওয়ার অভ্যাস অনেকের থাকলেও রাতের বেলায় এটি উপযুক্ত নয়। ক্যাফেইন কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত শরীরে কার্যকর থাকে, যা সহজে ঘুমাতে দেয় না। এ ছাড়া বিশেষ করে ভারী খাবারের পর কফি খেলে পেটে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়, যা বুক জ্বালাপোড়া বা ‘এসিড রিফ্লাক্স’-এর কারণ হতে পারে।
৪. লিকার বা কড়া চা
ব্ল্যাক টি (লাল চা) এবং গ্রিন টি-তেও ক্যাফেইন থাকে। কফির তুলনায় পরিমাণ কম হলেও ঘুমানোর আগে এগুলো খেলে গভীর ঘুম ব্যাহত হয়। রাতের খাবারের পর চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ক্যাফেইনমুক্ত হার্বাল টি বেছে নেওয়া ভালো।
৫. অ্যালকোহল
অনেকে মনে করেন অ্যালকোহল ঝিমুনি এনে দেয় বলে এটি ঘুমে সাহায্য করে। তবে প্রথমে একটু ঘুম ঘুম ভাব আনলেও, এটি রাতের শেষ ভাগের ঘুম মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অ্যালকোহল ‘আরইএম স্লিপ’ কমায়, রাতে বারবার ঘুম ভাঙায়, নাক ডাকা বাড়ায় এবং ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। এটি পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে জ্বালাপোড়াও তৈরি করে।
৬. প্যাকেটজাত ফলের রস (জুস)
ফলের রস স্বাস্থ্যকর মনে হলেও বাজারজাত জুসে প্রচুর প্রক্রিয়াজাত চিনি থাকে কিন্তু আঁশ (ফাইবার) থাকে না বললেই চলে। ফাইবার না থাকায় চিনি খুব দ্রুত রক্তে মিশে যায়, যা ঘুমানোর আগে রক্তের শর্করার ভারসাম্য নষ্ট করে। তাই ফলের জুসের বদলে আস্ত ফল খাওয়া অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।
৭. মিল্কশেক ও ডেজার্ট ড্রিংকস
চকলেট মিল্কশেক বা মিষ্টি ফ্লেভারের দুধ জাতীয় পানীয়গুলোতে প্রচুর চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) ও ক্যালরি থাকে। রাতের খাবারের পর এগুলো খেলে:
হজমপ্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়
অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণে ওজন বাড়ে
ঘুমের আগে বদহজম হতে পারে
৮. কার্বোনেটেড বা সোডাজাতীয় পানীয়
সোডা বা অন্যান্য গ্যাসিও পানীয় পাচনতন্ত্রের ভেতরে গ্যাস আটকে ফেলে। এর ফলে পেট ফাঁপা, ঢেকুর ওঠা, পেটে অস্বস্তি এবং বুক জ্বালাপোড়া হতে পারে।
বিকল্প হিসেবে কী পান করবেন?
সঠিক পানীয় নির্বাচন করলে তা হজম ও ভালো ঘুম দুটোতেই সাহায্য করে। রাতের জন্য উপযুক্ত পানীয়গুলো হলো:
সাধারণ পানি
হালকা গরম পানি
চিনি ছাড়া হার্বাল টি (ভেষজ চা)
হালকা গরম দুধ
পরিমিত পরিমাণে ঘোল বা বাটারমিল্ক
চিনি ছাড়া লেবু পানি
অতিরিক্ত চিনি বা ক্যাফেইন ছাড়াই শরীর আর্দ্র রাখলে সারারাত পাচনতন্ত্র স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে।
রাতের পর ভালো হজমের কিছু টিপস
ঘুমানোর অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করুন।
দেরিতে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে মশলাযুক্ত ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।
রাতের খাবারের পর কিছুক্ষণ হালকা হাঁটাচলা করুন।
রাতের খাবারের সময় একবারে অনেক বেশি পানি না খেয়ে সারাদিন ধরে পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
সূত্র: এনডিটিভি লাইফলাইন