“মুক্তিকামী জনগণের কাছে ৫ আগস্ট অবিস্মরণীয় বিজয়ের দিন"
ছবিঃ সংগৃহীত।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে যারা আত্মনিয়োগ করেছিলেন, সেই মুক্তিকামী জনগণের কাছে ৫ আগস্ট এক অবিস্মরণীয় বিজয়ের দিন এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে, আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনবদ্য অধ্যায়ের সূচনা করে। গণমানুষের জোয়ারের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় এগিয়ে যায়।’
আজ বুধবার (৫ আগস্ট) এক বার্তায় এসব কথা বলেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘সব শ্রেণি-পেশার মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই দিন আজ জাতীয়ভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে অনিঃশেষ সংগ্রাম করে এসেছে এবং ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম অগ্রযাত্রী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। গণতন্ত্রকামী সব রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে ওঠা সেই ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামই ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় পটভূমি রচনা করেছে। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে আপোষহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্ব, সাহস এবং দিকনির্দেশনা আন্দোলনকে শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘এই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি ছিল বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ। সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষক, আইনজীবী-সাংবাদিকসহ সকল পেশাজীবী মানুষ, কৃষক, পোশাকশ্রমিক থেকে শুরু করে সকল শ্রমজীবী মানুষ, গণতান্ত্রিক সকল রাজনৈতিক দলসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ দল-মত-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে গণঅভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে নারীদেরও ছিল ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশগ্রহণ। এই অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের আপামর জনতার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বাকস্বাধীনতা হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার লুণ্ঠন, অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়ম, অসংগতি ও দুর্বৃত্তায়নের অবসান ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা, ঐক্য এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অদম্য প্রত্যয়ের সমন্বিত বহিঃপ্রকাশ।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘মানুষের সেই অবারিত স্রোতকে দমিয়ে দেওয়ার জন্য ফ্যাসিস্ট সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মমতম ব্যবহার করেছে। মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি চালানো হয়েছে, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি বর্ষণ করা হয়েছে। স্বৈরাচারের নির্মমতা থেকে ছোট শিশুও রেহাই পায়নি। সেই গণহত্যার নির্মমতা উঠে এসেছে সারা বিশ্বের গণমাধ্যমে এবং জাতিসংঘের রিপোর্টেও। আমরা দেখেছি, রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ কীভাবে বুক চিতিয়ে ফ্যাসিস্টের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দাঁড়িয়েছিলেন; সেই দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করেছে, পাশাপাশি মুক্তির সাহস জুগিয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রামে ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরাম যেভাবে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন, তা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে। এমন অসংখ্য বীরের আত্মোৎসর্গ গণতন্ত্রকামী মানুষের সংগ্রামের চিরন্তন প্রেরণায় পরিণত হয়েছে।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। শত-শত মানুষ স্থায়ীভাবে অঙ্গহানি ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এখনো অনেক পরিবার তাদের স্বজন খুঁজে বেড়াচ্ছেন, এখনো আমাদের অনেক সহযোদ্ধা হাসপাতালে কিংবা বাড়িতে আঘাতের ব্যথা নিয়ে কাতরাচ্ছেন। ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী সকল শক্তি যে ঐক্যের মহাসোপানে পৌঁছেছিল, ফ্যাসিবাদের প্রশ্নে সেই বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা আজ সময়ের দাবি। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা কিংবা বিরোধী দলে থাকা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সফল হয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান। গণতন্ত্রের পক্ষে থাকা প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের সাংগঠনিক শক্তিমত্তা ও কাঠামোগত ভিত্তি ব্যবহার করে একযোগে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল।’
তিনি বলেন, ‘তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বিএনপির নেতা-কর্মীদের ত্যাগ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই সময় থেকে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে, সব ভেদাভেদ ছাপিয়ে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি শক্তির একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠেছিল, তাঁরা বাংলাদেশের পক্ষে। বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান) নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছিল ‘ফ্যাসিবাদ বনাম বাংলাদেশ’ এক নতুন মেরুকরণ। যদিও আজ দুই বছর পূর্তিতে সেই ঐক্যের মাঝে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব দৃশ্যমান। আমাদের নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে, ইতিবাচক সমালোচনা হতে পারে; তবে কোনো ধরনের অশালীন আচরণ না করেও একে অপরকে প্রশ্ন করা যায়, প্রজ্ঞা ও ইতিবাচকতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়। ভিন্নমতকে ধারণ করেই, পলাতক ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান যেন না ঘটে, সেই লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করতে হবে। কারণ হাজার-হাজার প্রাণের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্রকামী জনগণের অদম্য ঐক্যের মুখে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট অপশক্তির পতন ঘটে। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রগুলো থেকে ফ্যাসিবাদের দোসরেরা পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং বাংলাদেশে সূচিত হয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন অধ্যায়। ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়; এই অভ্যুত্থানের প্রকৃত নায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ। জুলাই আমাদের সবার। অথচ জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য যদি কেউ প্রতিযোগিতায় নামে, তা ক্রমেই আমাদের পেছনের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আমরা দেখেছি, একটি রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধকে একক অর্জন হিসেবে কুক্ষিগত করতে গিয়ে জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। সেই শিক্ষাকে পাথেয় করে, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে দেশ এগিয়ে যাবে, জুলাইকে হৃদয়ে ধারণ করব। আমাদের জাতীয় জীবনে যে সংগ্রাম ও লড়াইয়ের ইতিহাসগুলো আছে, তা চির অমলিন হয়ে থাকবে।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘জনগণ যেমন ১৯৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলেনি, তেমনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও কখনো ভুলবে না। বারবার ১৯৭১ আসবে না, বারবার ২০২৪ সালের জুলাইও আসবে না। আমরা চাইও না, এমন রক্তাক্ত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আর হোক, যেখানে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হাজারো মায়ের বুক খালি হবে। কিন্তু একাত্তর, চব্বিশের পাশাপাশি নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানসহ সকল সংগ্রামকে ধারণ করে জাতি আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ নির্ণয় করবে। ফ্যাসিবাদের প্রথম পনেরো বছর ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হামলা-মামলার শিকার যে দল, সেই বিএনপি আজ রাষ্ট্র পরিচালনায়। আর তাই বিগত সময়ের মানবাধিকার লংঘনের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা নির্বাচিত বিএনপি সরকারের লক্ষ্য। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে আন্তরিকভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিন্তা, রূপকল্প ও দেশ পুনর্গঠন কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শ ধারণ করে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা শহীদদের কাঙ্ক্ষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলব, ইনশাআল্লাহ।’