ইসলামে কন্যা ও বোনকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার শাস্তি কী?

ইসলামে কন্যা ও বোনকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার শাস্তি কী?

ছবিঃ সংগৃহীত।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মানুষের অধিকার সুনির্দিষ্ট ও সুনিশ্চিত করা হয়েছে। অথচ আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, বহু মানুষ নিয়মিত ইবাদত-বন্দেগি পালন করা সত্ত্বেও মেয়েদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেন কিংবা ছেলেরা কূটকৌশলে বোনদের অংশ আত্মসাৎ করে। এটি কেবল একটি পারিবারিক অন্যায় নয়, বরং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা লঙ্ঘনের শামিল এক জঘন্যতম অপরাধ।

দ্বীনের বাহ্যিক চর্চা ভেতরে বান্দার হক হরণের দ্বিমুখী রূপ

অনেক পিতা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করেন, হজ করেন, নিয়মিত জাকাত দেন এবং অন্যান্য পাপকাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখেন। অথচ নিজের অর্জিত বা পৈতৃক সম্পদ লিখে দেওয়ার সময় সজ্ঞানে মেয়েদের বঞ্চিত করে কেবল ছেলেদের নামে লিখে দেন। অনেকে এমন ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে বলেন, ‘সম্পদ আমার, আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দেব, শরিয়ত মানার দরকার নেই; জাহান্নামে যেতে হলেও যাব।’

এমন মনোভাব সরাসরি আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণার নামান্তর। একইভাবে যেসব ভাই পিতার সঙ্গে একজোট হয়ে বোনদের প্রাপ্য অংশ গ্রাস করে কিংবা কৌশলে বঞ্চিত করে, তারাও প্রকাশ্য জুলুমে লিপ্ত। হাশরের দিন কিয়ামতের ময়দানে এই জুলুমের কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব দিতে হবে।

ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘মদ পান করা হারাম, কিন্তু তার চেয়েও মারাত্মক অপরাধ হলো বান্দার হক হরণ করা। নিজের ঔরসজাত মেয়েকে তার বৈধ হক থেকে বঞ্চিত করা সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর একটি।’

কুরআনের দৃষ্টিতে উত্তরাধিকার বণ্টন সতর্কবার্তা

উত্তরাধিকার সম্পত্তি বণ্টনের সুনির্দিষ্ট বিধান দেওয়ার পর আল্লাহ তাআলা আনুগত্যকারীদের জন্য জান্নাত এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য অবধারিত জাহান্নামের ঘোষণা দিয়েছেন—

‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর এটিই মহা সাফল্য।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৩)

সীমালঙ্ঘনকারী হক হরণকারীদের বিষয়ে সতর্ক করে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন

 ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের নাফরমানি করে এবং তার নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন; সেখানে সে চিরকাল থাকবে এবং তার জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৪)

হাদিসের আলোকে সম্পদ আত্মসাতের শাস্তি

উত্তরাধিকারীর অংশ হরণ এবং অন্যায়ভাবে অন্যের জমি বা সম্পদ ভোগদখল করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুস্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন—

জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া

 ‘যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশের উত্তরাধিকারের অংশ হরণ করে পলায়ন করবে (বঞ্চিত করবে), কিয়ামতের দিন আল্লাহ জান্নাতে তার অংশ কেটে দেবেন (বঞ্চিত করবেন)।’ (ইবনে মাজাহ ২৭০৩)

জমিন দখলের ভয়াবহ শাস্তি

‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত পরিমাণ জমিও আত্মসাৎ করবে, কিয়ামতের দিন সাত স্তবক জমিন তার গলায় বেড়ি হিসেবে পরিয়ে দেওয়া হবে।’ (মুসলিম ১৬১০)

জীবদ্দশায় দান বনাম মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারের বিধান

সন্তানদের সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে শরিয়তের দুটি স্পষ্ট পর্যায় রয়েছে—

পিতার জীবদ্দশায় বণ্টন (হেবা বা দান): পিতা যদি জীবিত অবস্থায় সন্তানদের মাঝে সম্পদ বণ্টন করতে চান, তবে সব ছেলে ও মেয়েকে সমানভাবে দিতে হবে। কাউকে বেশি ও কাউকে বঞ্চিত করা স্পষ্ট জুলুম।

হজরত নোমান ইবনে বাশির (রা.) বর্ণনা করেন, তার পিতা তাকে একটি বিশেষ দান করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্যান্য সন্তানদের সমপরিমাণ দান করা হয়েছে কি না জানতে চান। পিতা ‘না’ বললে তিনি জবাবে বলেন—

‘তাহলে তুমি আমাকে এ বিষয়ে সাক্ষী রেখো না; কেননা আমি কোনো জুলুমের কাজে সাক্ষী হতে পারি না।’ (মুসলিম ১২৪৩)

মৃত্যুর পর বণ্টন (মিরাস বা উত্তরাধিকার): ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সমুদয় সম্পত্তি কুরআনের সুনির্দিষ্ট বিধান অনুসারে বণ্টিত হবে। সে ক্ষেত্রে সাধারণভাবে একজন ছেলে দুজন মেয়ের সমান অংশ লাভ করবে। এটি আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ বিধান, যা কোনো অবস্থাতেই পরিবর্তনযোগ্য নয়।

পারিবারিক সুখ-শান্তি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং আখেরাতের মুক্তি নির্ভর করে আল্লাহর বিধানের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ওপর। সামাজিক কুসংস্কার ও লোভের বশবর্তী হয়ে কন্যা কিংবা বোনদের অধিকার হরণ করলে কেবল দুনিয়াতেই পারিবারিক অশান্তি ও কলহ ডেকে আনে না, বরং আখেরাতেও চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা ও জাহান্নামের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করে। তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত শরিয়ত নির্দেশিত নীতিমালা অনুযায়ী ওয়ারিশদের প্রাপ্য হক যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়া।