ইমামতির ২৫ বছর, বিদায়বেলায় পেলেন ‘রাজকীয়’ সম্মান
সংগৃহীত
দীর্ঘ ২৫ বছর একই মসজিদে ইমামতি করার পর ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে ব্যতিক্রমী আয়োজনে বিদায় নিলেন মাওলানা আবুল হোসেন। দীর্ঘদিনের দায়িত্ব পালন শেষে প্রিয় ইমামকে রাজকীয়ভাবে বিদায় দিতে এমন আয়োজন করেন মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় এলাকাবাসী।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) জুমার নামাজের পর শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের নয়ান মাদবর কান্দি খানবাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে এ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাওলানা আবুল হোসেন টানা ২৫ বছর ধরে ওই মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার নামাজ, তারাবিহ নামাজসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি এলাকার মানুষকে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। দীর্ঘদিন একই মসজিদে দায়িত্ব পালনের কারণে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে তার গড়ে ওঠে গভীর আত্মিক সম্পর্ক।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদ প্রাঙ্গণে তাকে বিদায় জানান মুসল্লি, মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য ও এলাকাবাসী। এ সময় অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেন। ঘোড়ার গাড়িতে করে তাকে বিদায় জানানোর সময় সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়। ব্যতিক্রমী এ বিদায়ের দৃশ্য ধারণ করেন অনেকে।
বিদায় অনুষ্ঠানে মাওলানা আবুল হোসেন বলেন, ‘এই মসজিদের সঙ্গে আমার জীবনের ২৫টি বছর জড়িয়ে আছে। এখানকার মুসল্লি ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে আমি সবসময় ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি। বিদায়ের সময় তারা যেভাবে আমাকে সম্মান ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন, আমার কাছে মনে হয়েছে তারা আমাকে জান্নাতে পৌঁছে দিয়েছেন। আমি সবাইকে দোয়া করতে বলব এবং আমিও তাদের জন্য দোয়া করব।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য কালাম খান বলেন, ‘হুজুর আমাদের কাছে শুধু একজন ইমাম ছিলেন না, তিনি ছিলেন পরিবারের একজন অভিভাবকের মতো। দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের মসজিদে ইমামতি করেছেন। তার বিদায়ে আমরা খুবই কষ্ট পেয়েছি। তার সঙ্গে আমাদের এলাকার মানুষের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সহজে ভোলার নয়।’
বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজক রবিউল ইসলাম রাব্বি বলেন, ‘হুজুরের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তিনি ধর্মীয় বিষয় ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আমাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে ছিলেন। তাকে এভাবে ঘোড়ার গাড়িতে করে বিদায় দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। আবার বিদায়ের মুহূর্তে আমরা আবেগাপ্লুতও হয়েছি।’
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. জইনুদ্দিন খান বলেন, ‘মাওলানা আবুল হোসেন সাহেব দীর্ঘদিন অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রতি মুসল্লি ও এলাকাবাসীর ভালোবাসা থেকেই এই ব্যতিক্রমী বিদায়ের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তার বিদায়ে মসজিদের মুসল্লিসহ এলাকার মানুষ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন।’
স্থানীয়রা জানান, সাধারণত দায়িত্ব শেষ করে একজন ইমামকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দেওয়া হলেও মাওলানা আবুল হোসেনের ক্ষেত্রে আয়োজনটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ ২৫ বছরের সম্পর্ক ও ভালোবাসার স্মৃতি ধরে রাখতে তাকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে বিদায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা। ফলে জুমার নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় ব্যতিক্রমী এ বিদায় আয়োজন।
প্রিয় ইমামকে ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেওয়ার সময় মুসল্লি ও এলাকাবাসীর মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানান। আবার অনেকে তার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও সামাজিক অবদানের কথা স্মরণ করেন। এ সময় উপস্থিত মানুষের মধ্যে অনেকেই ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২৫ বছর ধরে একই মসজিদে দায়িত্ব পালন করা মাওলানা আবুল হোসেন শুধু ইমামের দায়িত্বই পালন করেননি; তিনি হয়ে উঠেছিলেন এলাকার মানুষের আপনজন। তার বিদায় তাই শুধু একজন ইমামের দায়িত্ব শেষ হওয়ার ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক বিদায় হিসেবেই দেখছেন মুসল্লি ও এলাকাবাসী।