পোড়া খাবার খেলেই কি ক্যানসার? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

পোড়া খাবার খেলেই কি ক্যানসার? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ফাইল ছবি

টোস্টের একপাশ পুড়ে কালো হয়ে গেছে, গ্রিলের সবজিতে লেগেছে পোড়া দাগ কিংবা আগুনে পুড়িয়ে খাওয়া মার্শম্যালো অনেকের কাছেই এসব খাবারের পোড়া স্বাদ ভালো লাগে। আবার দেখা যায় ভাজির পোড়া অংশ খেতে ভালো বাসেন অনেকেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোড়া খাবার কি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়? 

বহু বছর ধরেই পোড়া খাবার নিয়ে এ ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, অতিরিক্ত তাপে রান্না করা খাবারে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি হতে পারে, যেগুলো প্রাণীর ওপর করা গবেষণায় ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দেখা গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে পোড়া খাবার খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়ে গবেষণার ফল এখনো মিশ্র এবং নিশ্চিত নয়।

  • খাবার পুড়ে গেলে কী ঘটে?

আপনি যেখাবার খান আর সেটা যেভাবেই পোড়া হোক রাসায়নিক বিক্রিয়া একই রকম হয়।

খাবার রান্নার সময় মূলত ‘নন-এনজাইমেটিক ব্রাউনিং’ নামের একটি রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটে। এর দুটি প্রধান ধরন হলো ক্যারামেলাইজেশন ও মেইয়ার্ড রিঅ্যাকশন। 

খাবারে পানির উপস্থিতি না থাকলে তাপে ভেতরের চিনির ক্যারামেলাইজেশন ঘটে। অন্যদিকে, খাবারে থাকা অ্যামাইনো অ্যাসিড ও রিডিউসিং সুগার উচ্চ তাপে বিক্রিয়া করলে মেইয়ার্ড রিঅ্যাকশন হয়।

এর ফলে খাবারের রং গাঢ় হয় এবং খাবারের স্বাদ বেড়ে যায়। তবে যদি খাবার যখন ক্যারামেলাইজেশনের মাত্রা অনেক বেশি হয় তাহলে রান্না হয়ে কালো ও পুড়ে যায়, তখন এতে অ্যাক্রিলামাইড, হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস (এইচসিএ) এবং পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনস (পিএএইচ) তৈরি হতে পারে। 

  • অ্যাক্রিলামাইড কী?

অ্যাক্রিলামাইড একটি রাসায়নিক পদার্থ, যা কাগজ, রং ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। তবে উচ্চ তাপমাত্রায় ফল ও সবজির মতো উদ্ভিজ্জ খাবার রান্না করলেও অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হয়। বিশেষ করে আলুর মতো শর্করাযুক্ত খাবার ভাজা, বেক বা রোস্ট করার সময় অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

খাবারে থাকা থাকা চিনি অ্যাসপারাজিন নামের একটি অ্যামাইনো অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করলে এই রাসায়নিক তৈরি হয়। খাবার যত বেশি তাপমাত্রায় এবং যত বেশি সময় রান্না করা হবে, তাতে অ্যাক্রিলামাইডের পরিমাণও তত বাড়তে পারে। ফলে পুরোপুরি পুড়ে যাওয়া স্টার্চযুক্ত খাবারে সাধারণভাবে রান্না করা খাবারের তুলনায় বেশি অ্যাক্রিলামাইড থাকতে পারে।

  • অ্যাক্রিলামাইড কি ক্যানসার সৃষ্টি করে?

অ্যাক্রিলামাইড শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর এবং এটি মানুষের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় কি না এ বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে। কিছু প্রাণী গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাক্রিলামাইডের সংস্পর্শে ইঁদুরের কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ২০২৩ সালে ফুড জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করা অ্যাক্রিলামাইড এবং ক্যানসারের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায়নি।

অ্যাক্রিলামাইডকে ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার রিসার্চ এজেন্সি সম্ভাব্য মানব ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফল এখনো একমত নয়। ক্যানসার রিসার্চ ইউকে বলছে, অ্যাক্রিলামাইডযুক্ত খাবার খেলে ক্যানসার হয় এমন প্রমাণ যথেষ্ট নেই। 

অন্যদিকে, ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, প্রাণী গবেষণায় অ্যাক্রিলামাইড ও ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও মানুষের ওপর পরিচালিত বিপুলসংখ্যক গবেষণায় খাদ্যের মাধ্যমে অ্যাক্রিলামাইড গ্রহণের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির ধারাবাহিক সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

  • এবার কি পোড়া খাবার বাদ দিতে হবে  

পোড়া খাবার খেলে ক্যানসার হয় এই ভাবনা থেকে এই অভ্যাস বাদ দেবেন কিনা সেটা ভাবেন অনেকেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন অতিরিক্ত পোড়া খাবার খাওয়ার দরকার নেই বরং পরিমিতি হওয়াই ভালো। পুষ্টিবিদ ও শেফ ইভা ডি অ্যাঞ্জেলিস, এলডিএন বলেন, কোনও বিশেষ খাবারের বিষয়ে মা ভেবে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের দিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। তার মতে, আঁশ, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি সমৃদ্ধ সুষম খাবার খাওয়া, প্রক্রিয়াজাত ও লাল মাংস এবং অতিরিক্ত চিনি, চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার কম খাওয়ার অভ্যাস থাকলে মাঝে মধ্যে পোড়া খাবার খাওয়া নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার প্রয়োজন নেই।

ইভা ডি অ্যাঞ্জেলিস আরও বলেন, কত ঘন ঘন পোড়া খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পোড়া খাবারের স্বাদ অনেকের কাছেই ভালো লাগে। তবে তিনি নিজে এ ধরনের খাবার কেবল মাঝে মধ্যে খাওয়ার চেষ্টা করেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।