দাস ব্যবসার ক্ষতিপূরণে ব্রিটেনকে আফ্রিকানদের ভাস্কর্য নির্মাণের পরামর্শ জাতিসংঘের
ফাইল ছবি
ঐতিহাসিক দাস ব্যবসার জন্য দায় স্বীকার ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের অংশ হিসেবে ব্রিটেনসহ সাবেক দাস ব্যবসায়ী দেশগুলোকে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের অবদান স্মরণে ভাস্কর্য ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য নির্মূলবিষয়ক কমিটির (সিইআরডি) তৈরি একটি প্রতিবেদনে ‘রিপ্যারেটরি জাস্টিস’ বা ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের আওতায় এসব সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাস প্রথার কারণে সৃষ্ট ঐতিহাসিক ক্ষতি মোকাবিলায় সাবেক দাস ব্যবসায়ী ও ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী, সাবেক দাস ব্যবসায়ী দেশগুলোর বিভিন্ন জনসমাগমস্থল ও সরকারি পরিসরে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের অবদানকে সম্মান জানানো উচিত। এর অংশ হিসেবে ভাস্কর্য, শিল্পকর্ম ও অন্যান্য স্মারক নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে এমন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে ঐতিহাসিক দাসপ্রথা ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকার কথাও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিপূরণ শুধু অর্থ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ইতিহাসের স্বীকৃতি, শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বৈষম্য মোকাবিলার মাধ্যমে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনাও এর অংশ হওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের সুপারিশে ২০২০ সালের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। ব্রিটেনের ব্রিস্টলে দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কোলস্টনের একটি ভাস্কর্য ফেলে দেয় বিক্ষোভকারীরা।
জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাসব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে গণমাধ্যমে অন্যায্যভাবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। তাদের দাবিকে ‘অস্পষ্ট’ কিংবা কেবল ‘বামপন্থী’ অবস্থান হিসেবে দেখানোরও সমালোচনা করা হয়েছে।
তবে আফ্রিকানদের সম্মানে কী ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ বা জনস্মারক নির্মাণ করা হবে, তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয় বলেও জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে আর্থিক ক্ষতিপূরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণকে শুধু অর্থ স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
জাতিসংঘের সুপারিশে ঘৃণাত্মক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ, শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা এবং অভিবাসীদের বিরুদ্ধে জেনোফোবিয়া বা বিদেশিবিদ্বেষ মোকাবিলার মতো পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দাস প্রথা, এর পরিণতি এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে সঠিক ও পক্ষপাতমুক্ত তথ্য স্কুলের পাঠ্যবই ও শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতাদেরও ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদদের সমালোচনা
জাতিসংঘের এই সুপারিশ নিয়ে যুক্তরাজ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ এবং হিস্ট্রি রিক্লেইম সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক রবার্ট টম্বস। তার মতে, এর মাধ্যমে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়ার এবং মুক্ত আলোচনা সীমিত করার ঝুঁকি রয়েছে।
টম্বসের দাবি, দাস প্রথার ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ বিবরণে ব্রিটেনের দাস প্রথাবিরোধী আন্দোলনের ভূমিকাও তুলে ধরা প্রয়োজন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে দাস মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি প্রায়ই আলোচিত হয়। তবে দাস প্রথার অবসানে ব্রিটেনের ভূমিকা এবং একই সময়ে আফ্রিকার কিছু দাস ব্যবসায়ীর সঙ্গে সম্পর্কিত জটিল ইতিহাস যথেষ্ট আলোচিত হয় না।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক লরেন্স গোল্ডম্যানও জাতিসংঘের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তার মতে, অতীতের দাস প্রথা নিয়ে ব্রিটেনকে নির্দেশ দেওয়ার পরিবর্তে জাতিসংঘের উচিত বর্তমান বিশ্বের আধুনিক দাস প্রথার বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া।
গোল্ডম্যানের যুক্তি হলো, দুই শতাব্দীরও বেশি আগে ব্রিটেনেই সংগঠিত দাস প্রথাবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটেন বিশ্বজুড়ে দাস প্রথা বিলোপের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
বর্তমান বিশ্বেও লাখ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক দাসত্বের শিকার— এ বিষয়টিকে জাতিসংঘের জন্য বেশি জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
রাজপরিবারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
ক্ষতিপূরণের বিতর্কে ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
ব্রিটিশ রাজপরিবার একসময় দাস ব্যবসায় জড়িত রয়্যাল আফ্রিকান কোম্পানিকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সেই বাণিজ্য থেকে রাজপরিবার কতটা আর্থিক সুবিধা পেয়েছিল, তা নিয়ে গবেষণাও চলছে।
বিশেষ করে ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ রাজা তৃতীয় চার্লসের ক্যারিবীয় সফর ঘিরে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রীয় নয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোরও নিজেদের ভূমিকা ও সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে তথ্য গোপন, বাছাই করে প্রকাশ, পরিবর্তন বা গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস না করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়নের ক্ষতিপূরণ দাবি
দাস ব্যবসার ক্ষতিপূরণ এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই, এটি আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে।
ব্রিটেনসহ সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কাছ থেকে দাস প্রথার ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আইনি পথ খুঁজছে আফ্রিকান ইউনিয়ন। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে তারা।
আফ্রিকান ইউনিয়নের কিছু আইনজীবী মনে করছেন, আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে ব্রিটেনকে ক্ষতিপূরণ নিয়ে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে, ঘানার নেতৃত্বে জাতিসংঘে দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটি প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন। গত মার্চ মাসে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভোটে সাবেক দাস ব্যবসায়ী ও ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হয়।
তথ্যসূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ