লোক-দেখানো ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না

লোক-দেখানো ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না

ফাইল ছবি

ইবাদত মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়; ইবাদত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু মানুষের অন্তর বড়ই বিচিত্র—কখনো এমনও হয়, আল্লাহর জন্য শুরু করা একটি আমলের মধ্যে ধীরে ধীরে মানুষের প্রশংসার আকাঙ্ক্ষা ঢুকে পড়ে।

নামাজে মানুষ দেখছে কি না, দান করার কথা অন্যরা জানল কি না, কোরআন তিলাওয়াত শুনে মানুষ কী বলবে, দ্বীনি কাজ দেখে কে প্রশংসা করবে—এসব চিন্তা যখন ইবাদতের উদ্দেশ্যকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন সেখানে প্রবেশ করে রিয়া বা লোক-দেখানো।

বাহ্যিকভাবে আমলটি যত সুন্দরই হোক, আল্লাহর কাছে তার মূল্য নির্ভর করে অন্তরের নিয়তের ওপর। তাই একজন মুমিনের উচিত, শুধু আল্লাহর জন্য ইবাদত করা। কেননা লোক দেখানো ইবাদতের ব্যাপারে কোরআনে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।

আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের একটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘আর যখন তারা নামাজের জন্য দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়; তারা মানুষকে দেখায় এবং আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৪২) 

অন্যদিকে সুরা আল-মাউনেও আল্লাহ বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজির জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোক দেখায়।’ (সুরা : মাউন, আয়াত : ৪-৬) 

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আল্লাহ শুধু নামাজ না পড়ার ব্যাপারে সতর্ক করেননি; বরং এমন লোকের ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন, যারা নামাজ পড়ে কিন্তু মানুষের দেখানোর উদ্দেশ্যকে ইবাদতের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়।

লোক-দেখানো দানও আমল নষ্ট করে দিতে পারে

শুধু নামাজ নয়—দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত, দ্বীনি শিক্ষা, মানুষের সেবা—সব ধরনের নেক আমলেই নিয়তের বিশুদ্ধতা জরুরি।

আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে নিজেদের দানকে নষ্ট করো না—সে ব্যক্তির মতো, যে লোক দেখানোর জন্য তার সম্পদ ব্যয় করে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৪) 

এরপর আল্লাহ এমন ব্যক্তির আমলের উদাহরণ দিয়েছেন এমন একটি মসৃণ পাথরের সঙ্গে, যার ওপর সামান্য মাটি ছিল; প্রবল বৃষ্টি এসে সেই মাটি ধুয়ে পাথরটিকে পরিষ্কার করে দেয়। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে আমল থাকলেও রিয়ার কারণে তার প্রতিদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে।  রাসুলুল্লাহ (সা.) রিয়াকে ভয় করতে বলেছেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য আমল করে, আল্লাহ তার লোক দেখানো প্রকাশ করে দেবেন; আর যে ব্যক্তি মানুষের কাছে নিজের আমলের কথা প্রচার করে বেড়ায়, আল্লাহ তার বিষয়টি প্রকাশ করে দেবেন।

’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম) 

অর্থাৎ মানুষকে সন্তুষ্ট করার জন্য যে আমল করা হয়, তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। দুনিয়ায় মানুষ হয়তো প্রশংসা করল, কিন্তু আখিরাতে সেই প্রশংসা কোনো উপকারে আসবে না।

আমল অনেক হলেও নিয়ত ভুল হলে পরিণতি ভয়াবহ

সহিহ মুসলিমের একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তিন শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন প্রথমে ফয়সালা করা হবে—শহীদ, আলেম/কোরআন পাঠকারী এবং দানশীল ব্যক্তি। এক ব্যক্তি যুদ্ধ করে নিহত হয়েছিল। সে বলবে, ‘হে আল্লাহ! আপনার জন্য আমি যুদ্ধ করেছি।’ কিন্তু আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; তুমি যুদ্ধ করেছিলে যাতে মানুষ তোমাকে সাহসী বলে। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। এক ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেছিল, তা শিক্ষা দিয়েছিল এবং কোরআন পড়েছিল। কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন তাকে আলেম ও কোরআন পাঠকারী বলে। আরেক ব্যক্তি প্রচুর সম্পদ দান করেছিল, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন তাকে দানশীল বলে। তাদের প্রত্যেকের বাহ্যিক আমল বড় হলেও নিয়ত ছিল মানুষের প্রশংসা অর্জন করা। হাদিসে তাদের কঠিন পরিণতির কথা এসেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯০৫) 

লোক দেখানো ইবাদত থেকে বাঁচার উপায়

লোক দেখানো ইবাদত থেকে বাঁচতে হলে নিজের অন্তরকে নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে—‘আমি যদি এই আমলটি করি এবং কেউ তা না জানে, তবুও কি আমি তা করব?’ কিছু আমল গোপনে করার অভ্যাস করা যেতে পারে। যেমন—গোপনে সদকা করা, নির্জনে তাহাজ্জুদ পড়া, একান্তে দীর্ঘ সিজদা করা, কাউকে না জানিয়ে কারও উপকার করা। এতে বান্দার অন্তরে আল্লাহর সঙ্গে একান্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে।’ (সুরা : বাইয়্যিনাহ, আয়াত : ৫)

আল্লাহ তাআলা আমাদের লোক দেখানো ইবাদত করা থেকে বিরত রাখুন এবং আমাদের সব নেক-আমল আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।