কেন রিটেইল ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড
ফাইল ছবি
বাংলাদেশে ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম চালানো বিদেশি ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার বাংলাদেশ দেশের রিটেইল ও ক্ষুদ্র ব্যবসা (সিএমএসএমই) ব্যাংকিং কার্যক্রম বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে করপোরেট ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন, ট্রেজারি ও ওয়েলথ ম্যানেজমেন্ট কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ব্যাংকটির বৈশ্বিক ব্যবসায়িক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকটি ইতোমধ্যে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছে। মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের প্রক্রিয়া শেষ হলে রিটেইল পোর্টফোলিও হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
বৈশ্বিক কৌশল বদলের প্রভাব
ব্যাংকটির সাম্প্রতিক বৈশ্বিক কৌশল পর্যালোচনায় দেখা যায়, কম মুনাফার খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসার পরিবর্তে করপোরেট, ট্রেড ফাইন্যান্স ও উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের সেবায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের পুনর্গঠন করেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, রিটেইল ব্যাংকিং পরিচালনায় শাখা নেটওয়ার্ক, গ্রাহক সেবা, প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই মূলধন করপোরেট ব্যাংকিংয়ে ব্যবহার করলে তুলনামূলক বেশি আয় সম্ভব হওয়ায় আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো ব্যবসার অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করছে।
বাংলাদেশের ব্যবসার কতটা বিক্রি হচ্ছে
২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের রিটেইল ও সিএমএসএমই ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৮ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট আমানত ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার মধ্যে রিটেইল আমানত প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
এই পোর্টফোলিওর মধ্যে সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব, ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহঋণ, ক্রেডিট কার্ড এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার গ্রাহকদের একটি বড় অংশ রয়েছে।
কারা আগ্রহ দেখাচ্ছে
ব্যাংকিং সূত্রগুলো জানাচ্ছে, কয়েকটি দেশীয় বেসরকারি ব্যাংক রিটেইল পোর্টফোলিও অধিগ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে। আনুষ্ঠানিক বিক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হলে প্রতিযোগিতামূলক বিডিং হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গ্রাহকদের কী হবে
রিটেইল কার্যক্রম বিক্রি হলে গ্রাহকদের আমানত, ঋণ, ক্রেডিট কার্ড ও সংশ্লিষ্ট সেবা নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের মাধ্যমে নতুন মালিকানাধীন ব্যাংকে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের লেনদেনে গ্রাহকদের অর্থ বা হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন মালিকানায় চলে যাবে।
শতবর্ষের বেশি উপস্থিতি
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এ অঞ্চলে যাত্রা শুরু হয় ১৯০৫ সালে। পরে বিভিন্ন অধিগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন ও বৈদেশিক লেনদেনে ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে তাদের দেশে একাধিক শাখা ও এটিএম নেটওয়ার্ক রয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্তে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নিচ্ছে না; বরং সাধারণ গ্রাহকের খুচরা ব্যাংকিং থেকে সরে গিয়ে করপোরেট ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায় আরো বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান বিটপী দাশ চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাজারসংক্রান্ত গুঞ্জন বা জল্পনা-কল্পনার বিষয়ে তারা মন্তব্য করেন না।
তিনি বলেন, “স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড গ্রুপ নিয়মিতভাবে তাদের বৈশ্বিক ব্যবসায়িক মডেলের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে এবং যেখানে গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর সুবিধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, সেখানে সম্পদ কেন্দ্রীয়করণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।”
‘তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে বলেন, “স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের এই পরিকল্পনার কথা তারা জেনেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।”
তিনি বলেন, “স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড একটি বিদেশি ব্যাংক। নিজেদের কৌশল অনুযায়ী তারা যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে আমরা আশা করি, ব্যাংকটি যদি তাদের রিটেইল কার্যক্রম বন্ধ করে, তবে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হবে না এবং এ নিয়ে কোনো অসন্তোষও তৈরি হবে না।”