বন্যা-আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দারাজ বাংলাদেশ

বন্যা-আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দারাজ বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ত্রাণ ও পুনর্বাসনে সহায়তা দিতে প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের উদ্যোগ নিয়েছে দারাজ বাংলাদেশ। এ কর্মসূচির আওতায় সিলেটের মৌলভীবাজার এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর ৯০০-র বেশি বন্যা-দুর্গত পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আরও এক হাজার পরিবারের মাঝে বন্যাকালীন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাংলাদেশে বর্ষার পানি যেমন মাঠ ভরিয়ে তোলে, তেমনি কখনো কখনো সেই পানি ভাসিয়ে নেয় ঘর, সংসার ও জীবিকা। জরুরি ত্রাণ তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটালেও পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু হয়। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এবারের কর্মসূচিতে তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি পুনর্বাসন সহায়তাও যুক্ত করেছে দারাজ।

বাংলাদেশে গত ১২ বছরে ক্রেতা, বিক্রেতা ও কমিউনিটিকে ঘিরে একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে দারাজ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দুর্যোগের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকেই এবারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে পরিচালিত এই কর্মসূচি তিনটি ধাপে সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৯০০-র বেশি পরিবারের জন্য জরুরি ত্রাণ, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন সহায়তা এবং আরও এক হাজার পরিবারের জন্য বন্যাকালীন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

শুকনো খাবার, স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রী ও প্রাথমিক চিকিৎসার উপকরণ দিয়ে তৈরি ত্রাণ প্যাকেজ বিতরণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পাশাপাশি দারাজের স্বেচ্ছাসেবীরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করেন এবং অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে এমন পরিবারগুলো চিহ্নিত করেন।

প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পরিবারের হাতে ভাঙা ঘর মেরামতের জন্য টিনের চাল ও বাঁশ, বিছানাপত্র ও মশারি, রান্নার চুলা ও বাসনপত্র এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে।

দারাজ বাংলাদেশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার কামরুল হাসান বলেন,‘দারাজ আজ অনেক পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেরই একটা অংশ। তাই যখন সেই পরিবারগুলো কোনো দুর্যোগে পড়ে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোটা আমরা নিজেদের দায়িত্ব বলেই মনে করি। ত্রাণ দিয়ে আমাদের কাজ শুরু হয় ঠিকই, কিন্তু আমাদের লক্ষ্য থাকে মানুষ যেন আবার নিজের মতো করে জীবন গুছিয়ে নিতে পারে।’

এই কর্মসূচিতে দারাজের নিজস্ব কর্মীরাও অংশ নিয়েছেন। পাঁচটি বিভাগ থেকে স্বেচ্ছায় ২০ জন সহকর্মী ত্রাণসামগ্রী গোছানো থেকে শুরু করে দুর্গত এলাকায় যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের প্রয়োজন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের কাজে অংশ নেন।

দারাজ বাংলাদেশের চিফ পিপল অফিসার সৈয়দ আবদুল্লাহ মোরশেদ বলেন,‘আমাদের সহকর্মীরাও তো এই কমিউনিটিরই মানুষ। তাই কেউ তাদের বলেনি যেতে হবে, নিজেরাই সময় বের করে ছুটে গেছেন দুর্গত পরিবারগুলোর পাশে। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই বলে দেয়, আমাদের কর্মীরা যে কমিউনিটিতে কাজ করেন, তার প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা কতটা গভীর।’

মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রকল্প সমন্বয়ক সায়েম হোসেন। তিনি বলেন,‘সাতকানিয়া আর বাঁশখালীর পাড়ায় পাড়ায় হেঁটেছি আমরা। পানি নেমে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তার ছাপ ছিল সবখানে, দেয়ালে পানির দাগ, বেঁকে যাওয়া বা ভেসে যাওয়া টিনের চাল, বাঁশের বেড়া, হারিয়ে যাওয়া বিছানাপত্র আর হাঁড়িপাতিল। মানুষগুলো খুব বেশি কিছু চাননি। শুধু চেয়েছিলেন ঘুমানোর মতো একটা জায়গা, মাথার ওপর ভরসাযোগ্য একটা ছাদ, আর রান্না করার মতো সামান্য কিছু ব্যবস্থা। উঠানে বসে বসে জিজ্ঞেস করেছি, কে কী হারিয়েছেন। কারও দরকার নতুন চাল, কারও শুধু একটা কাঁথা-বালিশ। কাকে আগে সাহায্য দেব, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ-কারণ প্রায় প্রত্যেকেই কিছু না কিছু হারিয়েছিলেন।’

দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো দারাজের জন্য নতুন নয়। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালেও একাধিক জেলায় ৮৫ হাজারের বেশি বন্যা-দুর্গত মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিয়েছিল তারা। তবে এবারের কর্মসূচিতে তাৎক্ষণিক সহায়তার পাশাপাশি পুনর্বাসনের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।

দারাজ বাংলাদেশের জন্য এই কর্মসূচি শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী তাৎক্ষণিক সাহায্যেই আটকে নেই। মৌলভীবাজার, সাতকানিয়া আর বাঁশখালীর পরিবারগুলোর কাছে এর মানে, ঘর মেরামত, সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ফিরে পাওয়া, আর আগামী বর্ষায় নিজেদের প্রস্তুত রাখার একটা নতুন ভরসা।