রোহিঙ্গা নয়, তবে কাদের ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া?
ফাইল ছবি।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত মিয়ানমারের শরণার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।দেশটি থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শরণার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পর এই ভয় আরও তীব্র হয়েছে।
শরণার্থী নেতাদের কাছে প্রতিদিন শত শত ফোন আসছে। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা মানুষগুলো কাঁদছেন। তারা জানতে চাইছেন, এরপর কাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে।
মিয়ানমারের শরণার্থীদের এক নেতা রাফ* জানান, গত কয়েকদিনে তিনি প্রতিদিন ১০০টির বেশি ফোন পাচ্ছেন। অধিকাংশ মানুষই আতঙ্কের কথা জানিয়ে তাকে কিছু করার অনুরোধ করছেন।
প্রায় ১ হাজার ৫০০ শরণার্থী ফেরত
মালয়েশিয়া সরকার গত মঙ্গলবার মিয়ানমারের প্রায় ১ হাজার ৫০০ শরণার্থীকে নিজদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে করা একটি চুক্তির আওতায় অন্তত পাঁচ হাজার শরণার্থীকে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাওয়া মানুষের আশ্রয়ের অন্যতম গন্তব্য। তবে সম্প্রতি দেশটিতে শরণার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেফতারি বেড়েছে।
শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ভাষ্য, গত জুনে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন চুক্তির কথা জানানোর পর অভিযান আরও বেড়েছে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্মকর্তারা প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছেন। কখনো কখনো দিনে ৫০টির বেশি অভিযান চালানো হয়েছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশন জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ হাজার ৭০০টির বেশি অভিযান চালানো হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৭টি অভিযান হয়েছে।
১০ হাজারের বেশি মিয়ানমার নাগরিক আটক
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে এখন ১০ হাজারের বেশি মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, মালয়েশিয়ায় মোট ২ লাখ ১৫ হাজারের বেশি শরণার্থী রয়েছেন।
এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজারই মিয়ানমারের নাগরিক।
মিয়ানমারের শরণার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা। এ ছাড়া প্রায় ১৬ হাজার চিন জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং ৩৩ হাজার অন্যান্য মিয়ানমার জনগোষ্ঠীর সদস্য রয়েছেন।
প্রথম দফায় রোহিঙ্গারা নেই
মালয়েশিয়ায় থাকা মিয়ানমারের শরণার্থী নেতারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার ফেরত পাঠানো প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গার পরিচয় তারা পাননি।
ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের বড় অংশ মিয়ানমারের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বলে জানিয়েছেন তারা। এসব মানুষের অনেকের বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
রাফ বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো কঠিন হতে পারে। কারণ মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না।
মিয়ানমার সরকার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। যদিও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের বসবাস ও স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয় রয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন-পীড়নের পর লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যান।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অনেকে ওই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন
মিয়ানমারের শরণার্থী নেতাদের দাবি, মালয়েশিয়ায় চলতি বছরের অভিযানগুলোর কিছু শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকার ভিডিওর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে শরণার্থীদের বসবাসের এলাকাগুলোকে বিশৃঙ্খলার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
থ্রেডস, টিকটক ও ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে এসব ভিডিও হাজার হাজারবার শেয়ার হয়েছে। তবে এসব ভিডিও ও সরকারি অভিযানের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
কমছে সহায়তা, বাড়ছে ঝুঁকি
শরণার্থীদের ওপর চাপ বাড়ার সময়েই তাদের সহায়তায় কাজ করা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সক্ষমতা কমে গেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ হওয়ার পর মালয়েশিয়ায় শরণার্থীদের জন্য সহায়তার সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে কাজ করা সংগঠনগুলোও অর্থসংকটে পড়েছে।
শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘রিফিউজ ফর দ্য রিফিউজিস’-এর প্রতিষ্ঠাতা হেইডি কুয়াহ বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়নও কমেছে। ফলে ইউএনএইচসিআরকেও কর্মী কমাতে হয়েছে।
ইউএনএইচসিআর বর্তমানে বড় ধরনের অর্থসংকটে রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রয়োজনীয় অর্থের বড় একটি অংশ এখনো পাওয়া যায়নি।
পরিচয়পত্র থাকলেও গ্রেফতার
শরণার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, মালয়েশিয়ায় ইউএনএইচসিআরের কার্ড থাকা ব্যক্তিরাও গ্রেফতার হচ্ছেন। তাদের অনেককে প্রায় ১৪ দিন পর্যন্ত আটক রাখা হচ্ছে। এরপর কার্ড যাচাই করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আশ্রয়ের আবেদন করা এক নারী ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সময় নির্ধারণ করেছিলেন। এর মধ্যেই তাকে আটক করা হয়।
পরে ইউএনএইচসিআর নিশ্চিত করে, ওই নারী আশ্রয়প্রার্থী। তবু তিনি আটক রয়েছেন বলে শরণার্থী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি
মালয়েশিয়া থেকে শরণার্থী ফেরত পাঠানোর বিরোধিতা করেছে ইউএনএইচসিআর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
তাদের যুক্তি, মিয়ানমারে এখনো সহিংসতা চলছে। ফলে সেখানে ফেরত পাঠানো মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
মঙ্গলবার শরণার্থী ফেরত পাঠানোর এক দিন আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি বিমান হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
রাখাইন রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি। নিহতদের মধ্যে দোকানি, ক্রেতা ও পথচারী ছিলেন বলে দাবি করেছে আরাকান আর্মি।
‘স্বেচ্ছায় ফেরত’ নিয়ে প্রশ্ন
মালয়েশিয়া সরকার ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ‘স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন’ হিসেবে উল্লেখ করছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
তাদের বক্তব্য, যাদের অভিবাসন আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছিল, তাদের সিদ্ধান্ত কতটা স্বাধীন ও স্বেচ্ছায় ছিল তা যাচাই করা প্রয়োজন।
ইউএনএইচসিআরের সহকারী হাইকমিশনার এডেম ওসোর্নু বলেন, ফেরত যাওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাধীন, তথ্যভিত্তিক ও স্বেচ্ছায় নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, সর্বশেষ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তারা যুক্ত ছিল না। ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সঙ্গেও তাদের স্বাধীনভাবে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না।
ফলে তারা সত্যিই স্বেচ্ছায় দেশে ফিরেছেন কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মালয়েশিয়ার শরণার্থী নিবন্ধন নিয়েও উদ্বেগ
মালয়েশিয়া একই সময়ে শরণার্থীদের নিবন্ধনের জন্য নতুন ব্যবস্থাও এগিয়ে নিচ্ছে। ২০১৫ সালে দেশটি রিফিউজি রেজিস্ট্রেশন ডকুমেন্ট বা ডিপিপি কর্মসূচি চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল শরণার্থীদের নিবন্ধন করে একটি সরকারি নথি দেওয়া।
শরণার্থী নেতারা বলছেন, এই নথির মাধ্যমে কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত হলে এটি কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে।
তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়া ও অ্যাসাইলাম অ্যাকসেস বলেছে, ডিপিপি যেন শরণার্থীদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর হাতিয়ার না হয়।