জয় দিয়ে শেষ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি মহাকাব্যের

জয় দিয়ে শেষ আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি মহাকাব্যের

সংগৃহীত

চাওয়া-পাওয়ার হিসাবটা মিলে গিয়েছিল অনেক আগেই। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা- জাতীয় দলের হয়ে জেতার মতো প্রায় সবকিছুই জিতেছেন লিওনেল মেসি। বাকি ছিল শুধু প্রিয় সমর্থকদের সামনে থেকে বিদায় নেওয়া। সেই বিদায়ের রাতটাকেও নিজের মতো করে রাঙিয়ে গেলেন ফুটবলের মহাতারকা। গোল করলেন, গোল করালেন, আর শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিজয়ীর বেশেই মাঠ ছাড়লেন।

বুয়েনস এইরেসের স্তাদিও মনুমেন্তালে বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোরে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। নিকোলাস ওতামেন্দির গোল দিয়ে শুরু, নিকো পাজের গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ, আর শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি থেকে নিজের বিদায়ী ম্যাচের গোলটি করেন মেসি। জয় দিয়ে শেষ হলো আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অধ্যায়।

আর সেই সঙ্গে পূর্ণ হলো মেসির বিদায়ী রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব—২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল ও ৬৯ অ্যাসিস্ট। তিন বিভাগেই আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

শুরু থেকেই শুধু একটি ম্যাচ ছিল না
কিক-অফের আগেই বোঝা গিয়েছিল, মনুমেন্তালে সেদিন ফুটবলের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে আবেগ। মাঠে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল ১০ নম্বর পরা বিশাল এক আর্জেন্টিনা জার্সি। তবে সেখানে মেসির নামের জায়গায় লেখা ছিল ‘গ্রাসিয়াস’—ধন্যবাদ।

তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। জাতীয় সংগীতের সময়ও তাঁকে আবেগাপ্লুত দেখা যায়। গ্যালারিতে তখন একের পর এক গান, স্লোগান আর আতশবাজি। যেন পুরো স্টেডিয়াম আগেই বলে দিচ্ছিল—আজকের রাতটি শুধু একটি প্রীতি ম্যাচের রাত নয়।

ম্যাচের ১০ মিনিটে থামানো হয় খেলা। দাঁড়িয়ে প্রায় দুই মিনিট ধরে মেসিকে অভিবাদন জানান দর্শকেরা। গ্যালারিজুড়ে ওঠে ‘ওলে, ওলে, মেসি’ ধ্বনি। বেনিনের খেলোয়াড়েরাও এগিয়ে এসে শুভেচ্ছা জানান তাঁকে।

প্রথমার্ধে গোল নেই, মেসিরও নেই
আবেগের সেই পরিবেশের পর মাঠের ফুটবলে প্রথমার্ধে গোল পায়নি কোনো দল। তবে মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রথম ৪৫ মিনিটে বেনিনের বক্সে ছয়বার বল ছোঁন মেসি, নেন চারটি শট। ৩২ মিনিটে আসে সবচেয়ে বড় সুযোগটি। লাওতারো মার্তিনেজের পাস পেয়ে বাঁ পায়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেন মেসি। কিন্তু ভারসাম্য হারিয়ে ফেলায় ঠিকমতো শট নিতে পারেননি। বল চলে যায় পোস্টের পাশ দিয়ে।

বিরতিতে তাই স্কোরলাইন ০-০। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধেই বদলে যায় ম্যাচের গল্প।

মেসির কর্নারে ওতামেন্দির গোল
দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতেই এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৪৮ মিনিটে মেসির নেওয়া কর্নার থেকে আসা বলে দুর্দান্ত হেডে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি।

মেসির বিদায়ী ম্যাচে প্রথম গোলটিও যেন প্রতীকী হয়ে ওঠে। কারণ মেসির পাশাপাশি আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলছিলেন ওতামেন্দিও। মেসির কর্নার, ওতামেন্দির হেড—বিদায়ের রাতে দুই অভিজ্ঞ তারকার নাম জড়িয়ে গেল আর্জেন্টিনার প্রথম গোলে।

আবারও মেসি, এবার পাজের গোল
এরপরও থামেনি মেসির অবদান। ৬৫ মিনিটে বাম দিক থেকে তাঁর বাড়ানো বল পেয়ে দুর্দান্ত বাঁকানো শটে বল জালে পাঠান নিকো পাজ।

বেনিনের গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। আর মেসির বিদায়ী ম্যাচে তখন দুই গোলেই তাঁর সরাসরি অবদান—প্রথমটিতে কর্নার, দ্বিতীয়টিতে অ্যাসিস্ট।

শেষ পর্যন্ত নিজেই গোল করলেন মেসি
দুই সতীর্থকে দিয়ে গোল করানোর পর এবার নিজের পালা। ৭১ মিনিটে বেনিনের বক্সে অগাস্টিন জিয়াই ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা।

স্পট কিক নিতে এগিয়ে আসেন মেসি। আর এমন মুহূর্তে তাঁকে থামানো যেন অসম্ভবই। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে নিজের বিদায়ী ম্যাচে গোলের খাতা খুললেন তিনি।

আর্জেন্টিনা ৩-০ বেনিন।
আর সেটিই হয়ে গেল আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ গোল—আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১২৬তম।

শেষ বাঁশি, শেষবারের মতো
এরপর আর গোল হয়নি। রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও।
২০৮ ম্যাচ। ১২৬ গোল। ৬৯ অ্যাসিস্ট।

শুধু সংখ্যায় নয়, অর্জনেও অনন্য মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা—সবই জিতেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ বিদায়টা চেয়েছিলেন নিজের মানুষদের সামনে, নিজের শহরে, নিজের জার্সিতে।

সেই বিদায়টাও হলো তাঁর চেনা ছবিতে, জয় দিয়ে।

‘গ্রাসিয়াস লিও’
শেষ বাঁশির পরও অবশ্য রাত শেষ হয়নি। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মনুমেন্তালের আকাশে শুরু হয় বিশেষ ড্রোন শো। একের পর এক আলোর বিন্যাসে ফুটে ওঠে মেসিকে ঘিরে বিদায়ের আবেগ। আর শেষ দৃশ্যে আকাশে ভেসে ওঠে দুটি শব্দ, ‘গ্রাসিয়াস লিও’। ধন্যবাদ লিও।

একটি দেশের জার্সিতে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যে গল্প লিখেছেন মেসি, তার শেষ পাতাটাও তাই লেখা হলো তাঁর সবচেয়ে পরিচিত শব্দে জয় দিয়ে।