মেয়ে হয়েছে, মন খারাপ? কোরআন যা বলেছে
ফাইল ছবি
একটি সন্তান জন্মের পর পরিবারে আনন্দ থাকার কথা। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো এমন পরিবার আছে, যেখানে কন্যাসন্তান জন্মালে আনন্দের বদলে হতাশা দেখা যায়। ছেলে হলে আত্মীয়স্বজনকে সুখবর দেওয়া হয়, মিষ্টি বিতরণ করা হয়। আর মেয়ে হলে কারও মুখ ভার হয়ে যায়, কেউ খবরটি জানাতেও সংকোচবোধ করেন। কখনো সেই হতাশার চাপ গিয়ে পড়ে সদ্য সন্তান জন্ম দেওয়া মায়ের ওপর।
অথচ সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে, তা মা-বাবার ইচ্ছাধীন নয়। কোরআন কন্যাসন্তানের জন্মকে অপমান মনে করার মানসিকতার সমালোচনা করেছে। ইসলাম মেয়েদের লালন-পালন, উত্তরাধিকার, বিয়েতে সম্মতি ও আর্থিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছে।
তাহলে কন্যাসন্তান সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
সন্তান আল্লাহর দান: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদের পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন, আর যাকে ইচ্ছা নিঃসন্তান রাখেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা শুরা: ৪৯-৫০)
সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে, তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তাই কন্যাসন্তান জন্মানোর কারণে মায়ের ওপর অসন্তুষ্ট হওয়া, তাঁকে দোষারোপ করা কিংবা তালাকের হুমকি দেওয়া অন্যায়। সন্তানের লিঙ্গের জন্য মাকে দায়ী করার কোনো যুক্তি নেই।
জাহেলি মানসিকতাকে কোরআনের তিরস্কার: ইসলামপূর্ব আরব সমাজের একাংশে কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জার বিষয় মনে করা হতো। কোরআন সেই মানসিকতার ছবি তুলে ধরে বলেছে, ‘তাদের কাউকে যখন কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাকে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তার গ্লানির কারণে সে নিজ সম্প্রদায় থেকে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে, অপমান সহ্য করে তাকে রেখে দেবে, নাকি মাটিতে পুঁতে ফেলবে। দেখো, তারা কত নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়!’ (সুরা নাহল: ৫৮-৫৯)
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। কন্যাসন্তানের জন্মের খবরকে আল্লাহ ‘সুসংবাদ’ বলেছেন। অথচ সেই খবর শুনে যারা অপমান বোধ করত, তাদের মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। সেই মানসিকতা কখনো শিশুকন্যাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো ভয়াবহ অপরাধে রূপ নিত। কোরআন কেয়ামতের বিচারের প্রসঙ্গে বলেছে, ‘আর যখন জীবন্ত সমাহিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির: ৮-৯)
শিশুটির অপরাধ কী ছিল? সে শুধু মেয়ে হয়ে জন্মেছিল। এই আয়াতগুলো মনে করিয়ে দেয়, কন্যাসন্তানের জন্ম লজ্জা বা অপমানের বিষয় নয়। তার প্রতি অবহেলা কিংবা নিষ্ঠুর আচরণেরও কোনো অজুহাত নেই।
কন্যাসন্তান লালন-পালনের মর্যাদা
ইসলাম কন্যাসন্তানকে ভালোভাবে বড় করার দায়িত্বের পাশাপাশি এর প্রতিদানের কথাও জানিয়েছে। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুটি মেয়েকে সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কেয়ামতের দিন আমি ও সে এভাবে পাশাপাশি থাকব।’ এরপর তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখান। (সহিহ মুসলিম: ২৬৩১)
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে এসেছে, এক নারী তাঁর দুই মেয়েকে নিয়ে সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। আয়েশা (রা.) তাঁকে একটি খেজুর দিলে তিনি সেটি দুই মেয়ের মধ্যে ভাগ করে দেন, নিজে কিছু খাননি। ঘটনাটি শুনে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি কন্যাসন্তানের দায়িত্ব পায় এবং তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নাম থেকে আড়াল হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৬২৯)
কন্যাসন্তানকে ভালোভাবে বড় করা মানে তার খাবার, পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, স্নেহ দেওয়া এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তোলা। মেয়ে হয়েছে বলে তার যত্নে অবহেলা করা কিংবা ছেলের তুলনায় তাকে কম সুযোগ দেওয়া এই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কন্যার জন্মে আনন্দ প্রকাশ
কোরআন কন্যাসন্তানের জন্মকে ‘সুসংবাদ’ বলেছে। তাই মেয়ের জন্মে হতাশ হওয়া বা একে পরিবারের জন্য অপমান মনে করার কোনো কারণ নেই। ছেলে জন্মালে পরিবার আনন্দ করবে, মেয়ের জন্মেও আনন্দ করবে। আত্মীয়স্বজনকে সুখবর দেওয়া, সন্তানকে সাদরে গ্রহণ করা এবং তার জন্য দোয়া করা স্বাভাবিক পারিবারিক আনন্দের প্রকাশ।
মেয়ের জন্ম উপলক্ষে বিশেষ কোনো আয়োজনকে ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক মনে করার প্রয়োজন নেই। মূল কথা হলো, ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানকেই ভালোবাসা, যত্ন ও মর্যাদা দিয়ে গ্রহণ করা।
সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের অধিকার
অনেক পরিবারে মেয়েদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। কখনো বলা হয়, মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাই বাবার সম্পত্তিতে তার আর কোনো দাবি নেই। অথচ কোরআন নারীদের উত্তরাধিকারের অধিকার স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ রয়েছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ রয়েছে, তা অল্প হোক কিংবা বেশি- এক নির্ধারিত অংশ।’ (সুরা নিসা: ৭)
কে কতটুকু উত্তরাধিকার পাবেন, তা নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী কারা আছেন এবং শরিয়তের নির্ধারিত বিধানের ওপর। তবে মেয়ের বিয়ে দেওয়া, বিয়েতে খরচ করা কিংবা উপহার দেওয়ার অজুহাতে তার প্রাপ্য উত্তরাধিকার বাতিল করা যায় না।
মেয়ের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দেওয়া পরিবারের দায়িত্ব। তাকে চাপ দিয়ে সম্পত্তির অধিকার ছেড়ে দিতে বাধ্য করাও ন্যায়সংগত নয়।
বিয়েতে মেয়ের সম্মতির গুরুত্ব
বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মেয়ের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবকের দায়িত্ব উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচনে সাহায্য করা, নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক কুমারী মেয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে এসে জানাল, তার বাবা তার অনিচ্ছায় তাকে বিয়ে দিয়েছেন। তখন রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে নিজের সিদ্ধান্ত বেছে নেওয়ার অধিকার দেন। (সুনান আবু দাউদ: ২০৯৬)
এই ঘটনা বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের সম্মতির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে বিয়ের বৈধতা ও অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে ইসলামী ফিকহে বিস্তারিত বিধান রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো বিরোধ দেখা দিলে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মোহরানার মালিকানা নারীর
বিয়ের সময় স্ত্রীকে যে মোহরানা দেওয়া হয়, তা তাঁর নিজস্ব সম্পদ। বাবা, ভাই কিংবা স্বামী তাঁর সম্মতি ছাড়া তা নিয়ে নিতে পারেন না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নারীদের তাদের মোহরানা খুশিমনে আদায় করে দাও। তবে তারা যদি সন্তুষ্টচিত্তে তা থেকে তোমাদের কিছু ছেড়ে দেয়, তাহলে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করতে পারো।’ (সুরা নিসা: ৪)
মোহরানা নারীর প্রাপ্য অধিকার। স্ত্রী স্বেচ্ছায় কিছু ছেড়ে দিলে তা গ্রহণ করা যায়। কিন্তু চাপ সৃষ্টি করে কিংবা তাঁর সম্মতি ছাড়া মোহরানা নিয়ে নেওয়া এই নির্দেশনার পরিপন্থী। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হলে তার শিক্ষা, নিরাপত্তা ও আর্থিক অধিকার নিয়েও ভাবতে হবে। জন্ম থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত তার যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার অধিকারগুলোও রক্ষা করতে হবে।
ইসলাম যা শিখিয়েছে, আমরা তা কতটা মানি?
কন্যাসন্তানের জন্ম, লালন-পালন, উত্তরাধিকার, বিয়েতে সম্মতি ও মোহরানার বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারে মেয়েরা এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। কোথাও মেয়ের জন্মে মা কষ্ট পান, কোথাও মেয়েকে ছেলের চেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। কোথাও উত্তরাধিকার দেওয়া হয় না, বিয়ের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় কিংবা মোহরানা আত্মসাৎ করা হয়।
এসব ক্ষেত্রে নিজেদের আচরণ নিয়ে ভাবা জরুরি। ধর্মীয় বিধান জানা আর তা মেনে চলা এক বিষয় নয়। কোরআনের শিক্ষা পরিবারে বাস্তবায়ন করতে হলে মেয়েদের প্রতি আচরণেও তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
কন্যাশিশু দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক, ছেলের জন্মে যেমন আনন্দ করি, মেয়ের জন্মেও তেমনই আনন্দ করব। তাকে স্নেহ, শিক্ষা ও নিরাপত্তায় বড় করব। বড় হওয়ার পর তার অধিকারগুলোও রক্ষা করব। মেয়ে হয়েছে বলে হতাশ হবেন না। সে-ও আপনার সন্তান। তার জন্ম কোনো অপমান নয়, আর তার অধিকার কেড়ে নেওয়ারও কোনো অজুহাত নয়।