কারো প্রশংসা করার ক্ষেত্রে ইসলামের নীতিমালা
ছবিঃ সংগৃহিত।
একটি সুন্দর কথা কখনো কখনো একজন মানুষকে আরও ভালো হওয়ার সাহস জোগায়। কারও ভালো কাজের স্বীকৃতি তাকে উত্সাহিত করে, আর আন্তরিক প্রশংসা সম্পর্কেও তৈরি করে উষ্ণতা। তবে প্রশংসার এই সুন্দর দিকটি যেন মিথ্যা, বাড়াবাড়ি বা তোষামোদের আড়ালে হারিয়ে না যায়, সেদিকেও ইসলামের রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
সত্য ও বাস্তব গুণের প্রশংসা
প্রশংসার প্রথম শর্ত হলো তা বাস্তবসম্মত হওয়া। কারও মধ্যে যে গুণ রয়েছে, সেটিই বলা যাবে; এমন কোনো গুণ তার মধ্যে আছে বলে প্রচার করা যাবে না, যা বাস্তবে নেই। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৭০)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে এক ব্যক্তির প্রশংসা করা হলে তিনি সতর্ক করে বলেন, তুমি তোমার সঙ্গীর ঘাড় কেটে দিলে। এরপর তিনি বলেন, কারও প্রশংসা করতেই হলে যেন বলা হয়, আমি তাকে এমন মনে করি; তবে তার প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভালো জানেন। (বুখারি, হাদিস: ২৬৬২)
হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের বাহ্যিক ভালো দিক দেখে তার অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করা উচিত নয়। যেমন কাউকে ‘অবশ্যই আল্লাহর অতি প্রিয় বান্দা’, ‘নিশ্চিত জান্নাতি’, ‘সবার চেয়ে জ্ঞানী’ কিংবা ‘সবার চেয়ে বেশি পরহেজগার’, এ ধরনের কথা বলা সমীচীন নয়। কারণ মানুষের অন্তরের বাস্তব অবস্থা আল্লাহই জানেন।
অতিরঞ্জন ও তোষামোদ থেকে বেঁচে থাকা
প্রশংসার নামে তোষামতে লিপ্ত হওয়া নিন্দনীয় কাজ। এতে প্রশংসাকারী মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারে এবং প্রশংসিত ব্যক্তিও নিজের ব্যাপারে অতিরিক্ত আত্মতুষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাধারণত আত্মতুষ্ট মানুষদের খুশি রাখতে কেউ কেউ তাদের সামনে অতিরিক্ত তোষামোদ করে, আর তারা সেগুলোতে প্রভাবিত হয়ে নিজেদের বড় কিছু ভাবতে শুরু করে। এ জন্যই হয়ত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের ব্যাপারে সতর্ক হও।’ ( মুসলিম, হাদিস : ৩০০২)
অন্য এক ঘটনায় মিকদাদ (রা.) একজন ব্যক্তিকে হজরত উসমান (রা.)-এর অতিরিক্ত প্রশংসা করতে দেখে তার মুখে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন এবং বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩০০২)
এখানে উদ্দেশ্য এমন প্রশংসা থেকে সতর্ক করা, যা সীমা অতিক্রম করে তোষামোদে পরিণত হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাবান, জনপ্রিয় বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সামনে স্বার্থ হাসিলের জন্য অযাচিত প্রশংসা করা, ইসলামের প্রশংসার আদবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রশংসায় উদ্দেশ্য ও পরিণতি বিবেচনা করা
কোনো ব্যক্তির ভালো কাজের প্রশংসা যদি তাকে আরও ভালো কাজে উত্সাহিত করে, তাহলে তা কল্যাণকর হতে পারে। কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করে তাদের প্রশংসা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে। এরপর নামাজে বিনয়, অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকা, জাকাত আদায়সহ তাদের বিভিন্ন গুণ উল্লেখ করেছেন। (সুরা মুমিনুন, আয়াত:১ু৪)
এ থেকে বোঝা যায়, ভালো গুণের স্বীকৃতি দেওয়া মানুষের মধ্যে সেই গুণের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। তবে প্রশংসা এমন হওয়া উচিত নয়, যা ব্যক্তিকে নিজের আমল নিয়ে আত্মতুষ্ট করে ফেলে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিস্টানরা মরিয়মের পুত্র ঈসার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে।’ (বুখারি, হাদিস:৩৪৪৫)
এ হাদিস প্রশংসার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, ভালোবাসা ও সম্মান থাকবে, কিন্তু তা সত্যের সীমা অতিক্রম করবে না।
তাই কারো প্রশংসা করার ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত প্রশংসা করা যেতে পারে, তবে কোনো অবস্থাতেই সীমালঙ্ঘন করে তাকে অহংকারে লিপ্ত করা যাবে না।