তিস্তায় পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না, অভিযানে জব্দ ২৫ হাজার ঘনফুট

তিস্তায় পাথর উত্তোলন বন্ধ হচ্ছে না, অভিযানে জব্দ ২৫ হাজার ঘনফুট

ছবি: সংগৃহীত

ভোরের আলো ফোটার আগেই তিস্তা নদীতে শুরু হয় ইঞ্জিনচালিত নৌকার গর্জন। নৌকায় বসানো লোহার যন্ত্র দিয়ে খোঁড়া হয় নদীর তলদেশ। সেখান থেকে তুলে আনা হয় পাথর। পরে ট্রাকে বোঝাই করে নেওয়া হয় বিভিন্ন এলাকায়। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় এভাবেই চলছে তিস্তা নদী থেকে পাথর উত্তোলন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় একাধিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ চালিয়ে আসছে। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে পাথর ও সরঞ্জাম জব্দ করলেও বন্ধ হচ্ছে না উত্তোলন।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকাল থেকে ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নে তিস্তা নদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। অভিযানে অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রায় ২৫ হাজার ঘনফুট পাথর, পাথর ভাঙার পাঁচটি মেশিন এবং ৪০০ ঘনফুট পাথরবোঝাই একটি ট্রাক জব্দ করা হয়।

ডিমলা উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদীর জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিমলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইমরানুজ্জামান ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় টেপাখড়িবাড়ি ও গয়াবাড়ি ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ২২ জন সদস্য ও পুলিশের একটি দল।

উপজেলা প্রশাসন জানায়, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে তীরভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে এবং জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

ইউএনও ইমরানুজ্জামান বলেন, নদী বা মাটির তলদেশ থেকে পাথর ও বালু উত্তোলন আইনত নিষিদ্ধ। এ ধরনের কার্যক্রমের অভিযোগ পেলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। তিস্তা নদী রক্ষায় অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে।

তিনি আরও জানান, গত ১ সেপ্টেম্বরও অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল। ওই অভিযানে তিনটি লোহার দণ্ড, প্লেন শিট দিয়ে তৈরি ১২টি লোহার ডালি ও ছয়টি বেলচা জব্দ করা হয়। জব্দ করা মালামাল বার্ণিঘাট বিজিবি ফাঁড়ির হেফাজতে রাখা হয়েছে। ওই অভিযানে বিজিবির ৫১ ব্যাটালিয়নের সদস্য, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রওশন কবির এবং পুলিশের একটি দল অংশ নেয়।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান চালানোর পরও পাথর উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দা জুলহাস ইসলাম বলেন, তিস্তা ব্যারাজের আশপাশ, তিস্তা বাজার, তেলির বাজার, চরখড়িবাড়ি, বাইশপুকুর, কালীগঞ্জ ও ভেন্ডাবাড়ি এলাকায় প্রায় ১৫টি প্রভাবশালী চক্র পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। এসব চক্র শতাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে নদীর তলদেশ থেকে পাথর তুলে স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কেনাবেচা ও পরিবহন করছে।

শেখ বশির নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লোহার যন্ত্র ব্যবহার করে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত খুঁড়ে পাথর তোলা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের অভিযান সত্ত্বেও এ কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু পাথর ও সরঞ্জাম জব্দ করে এ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব নয়। অবৈধ উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোকে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। তাদের আশঙ্কা, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকলে তিস্তার পরিবেশ ও নদীপারের মানুষের জীবন-জীবিকা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।