অলিভ অয়েল খেলেই কমবে ডায়াবেটিস, যা বলছে গবেষণায়
ছবি সংগৃহীত।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাবারের তালিকা নিয়ে সচেতন থাকেন অনেকেই। ভাত, রুটি, পাউরুটি কিংবা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, সেদিকে নজর রাখেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিরা। তবে শুধু খাবারের ধরন বা পরিমাণ নয়, খাবার খাওয়ার আগে শরীরে কোন উপাদান প্রবেশ করছে, তার ওপরও রক্তে শর্করার ওঠানামা কিছুটা নির্ভর করতে পারে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই একটি সম্ভাবনার কথা। গবেষকদের দাবি, কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার আগে অলিভ অয়েল বা জলপাইয়ের তেল গ্রহণ করলে খাবারের পর রক্তে শর্করার বৃদ্ধি কিছুটা কম হতে পারে।
অলিভ অয়েল নিয়ে কী বলছে গবেষণা?
জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডাইসুকে ইয়াবে এবং তার দলের এই গবেষণায় পরীক্ষা করা হয়েছে, গ্লুকোজ গ্রহণের আগে বিভিন্ন ধরনের তেল খেলে রক্তে শর্করার মাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ডায়াবেটিস সাময়িকীতে। গবেষণায় ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, গ্লুকোজ গ্রহণের আগে অলিভ অয়েল খাওয়ানো ইঁদুরগুলোর রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছিল। বিশেষ করে গ্লুকোজ গ্রহণের ১৫ ও ৩০ মিনিট পর এই পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গবেষণার ফলাফল থেকে ধারণা করা হচ্ছে, খাবার খাওয়ার আগে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে শরীরে গ্লুকোজ প্রবেশের গতি বা রক্তে শর্করার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে এই ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করবে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
যেভাবে কাজ করতে পারে অলিভ অয়েল
সাধারণত ভাত, রুটি বা অন্য কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবার খাওয়ার পর হজমপ্রক্রিয়ায় সেগুলো ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি হয়। এই গ্লুকোজ ক্ষুদ্রান্ত্রের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করে। ফলে খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে। কত দ্রুত এই মাত্রা বাড়বে, তা নির্ভর করে খাবারের ধরন, পরিমাণ, হজমের গতি এবং শরীরের ইনসুলিনের কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
অলিভ অয়েলে রয়েছে ফ্যাট, যা পাকস্থলী থেকে খাবার ক্ষুদ্রান্ত্রে যাওয়ার গতি ধীর করতে পারে। ফলে গ্লুকোজ শোষণের গতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। গবেষকদের ধারণা, এই প্রক্রিয়া খাবারের পর রক্তে শর্করার প্রাথমিক বৃদ্ধি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে রক্তে শর্করার মাত্রা কম বেড়েছে মানেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে, এমনটা নয়। খাবারের পর শর্করার প্রতিক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। তাই গবেষণার এই ফলাফলকে সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবেই দেখা উচিত।
অন্য তেলের তুলনায় কেমন ফল মিলেছে?
গবেষণায় অলিভ অয়েলের পাশাপাশি ফ্ল্যাক্সসিড অয়েল, নারিকেল তেল, মাছের তেল এবং লার্ডের মতো অন্যান্য ফ্যাটজাতীয় উপাদানও পরীক্ষা করা হয়েছিল। বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অলিভ অয়েল তুলনামূলকভাবে ভালো ফল দেখিয়েছে বলে গবেষণায় উঠে আসে।
তবে এই ফলাফলের ভিত্তিতে অলিভ অয়েলকে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা কিংবা রক্তে শর্করা কমানোর বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর করা হয়েছে। মানুষের শরীরে এর প্রভাব, প্রয়োজনীয় পরিমাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের তালিকায় নজর দিন
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুধু একটি তেল বা নির্দিষ্ট কোনো খাবারের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের খাবারের পরিমাণ, কার্বোহাইড্রেটের ধরন, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করছেন সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ডাল ও অন্যান্য ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রাখা উপকারী হতে পারে। পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। ভাত বা রুটি একেবারে বাদ দেওয়ার পরিবর্তে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করা ভালো।
কার্বোহাইড্রেট খাওয়ার আগে অলিভ অয়েল গ্রহণ রক্তে শর্করার প্রাথমিক বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিতে সুষম খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, রক্তে শর্করা পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল এক্সপ্রেস