১৫৫ বছরেও বদলায়নি চিকন্দী আদালতের ঠিকানা, সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ ভবন
ছবি: সংগৃহীত
শরীয়তপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে চিকন্দী গ্রাম। সেখানে ১৫৫ বছর ধরে চলছে একটি আদালতের কার্যক্রম। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এ আদালত জেলা প্রতিষ্ঠার পরও শহরে স্থানান্তরিত হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ মামলা নিয়ে চলছে বিচারকাজ।
তবে দীর্ঘদিন সংস্কার ও মেরামতের অভাবে পুরোনো আদালত ভবনটির বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়ে পানি পড়ে বলে অভিযোগ আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের। পাশাপাশি গণশৌচাগার ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থী ও সেবাপ্রার্থীদের।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭২ সালে মুনসেফ আদালত হিসেবে চিকন্দীতে আদালতটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৮৬০ সালের দিকে পদ্মা নদীতে ভ্রাম্যমাণ চৌকি আদালতের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালিত হতো। নদীভাঙনের কারণে পরে সেটি চিকন্দীতে সরিয়ে আনা হয়। প্রথম দিকে গোলপাতার ঘরে বিচারকাজ চললেও ১৯২৬ সালে নির্মাণ করা হয় একতলা আদালত ভবন।
প্রায় সাড়ে ১০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা আদালত চত্বরে রয়েছে পুরোনো আদালত ভবন, বিচারকদের আবাসন, মসজিদ, পুকুর ও বিভিন্ন গাছপালা। পুরোনো স্থাপনা ও দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে আদালতটি স্থানীয়ভাবে ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।
১৯৮৪ সালে শরীয়তপুর জেলা প্রতিষ্ঠার পর জেলা শহরে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে চিকন্দীর আদালতটি আগের স্থানেই থেকে যায়। বর্তমানে এখানে সদর ও জাজিরা উপজেলার দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি পারিবারিক, অর্থঋণ ও লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দুই বিচারকসহ ১৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কর্মরত রয়েছেন। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৩০০।
চিকন্দী আদালতের নাজির কর্মকর্তা রিয়াদ করিম বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানে আদালতের কার্যক্রম চলছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আদালতটি এখনো চিকন্দী গ্রামেই পরিচালিত হচ্ছে। শরীয়তপুর সদর ও জাজিরা-দুই উপজেলার মানুষের প্রতিবছর ৭ থেকে ৮ হাজার মামলা নিয়ে এখানে আসতে হয়।
তিনি বলেন, বিচারকদের থাকার আবাসন এখন আর উপযোগী নয়। বিচারকদের জন্য মাত্র একটি ভবন রয়েছে। নতুন আবাসন ও মামলা পরিচালনার জন্য নতুন ভবন প্রয়োজন। জরুরি কাগজপত্র সংরক্ষণেরও পর্যাপ্ত জায়গা নেই। তাই জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
আইনজীবীদের অভিযোগ, ঐতিহাসিক এ আদালতের গুরুত্ব থাকলেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন তেমন হয়নি। দীর্ঘদিন সংস্কার ও মেরামতের অভাবে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অ্যাডভোকেট হেলাল হোসেন আকন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি চিকন্দী আদালতে আইন পেশায় যুক্ত। অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নয়ন হলেও ঐতিহ্যবাহী এ আদালতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ভবনটি সংস্কারের পাশাপাশি নতুন আদালত ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট রুবায়েদ আনোয়ার মনির হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন অংশ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। ব্রিটিশ আমলের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভবনটি দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।
অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান তালুকদার বলেন, ব্রিটিশ আমলের এ আদালতের সঙ্গে এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। আদালতের অবকাঠামো রক্ষার পাশাপাশি নিরাপত্তা জোরদার এবং পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা প্রয়োজন।
চিকন্দী আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন তালুকদার বলেন, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এ আদালত এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা ও বিচারসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
চিকন্দী আদালতের সেরেস্তাদার মিজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন এলাকা থেকে জমিজমাসহ নানা বিরোধের মামলা নিয়ে প্রতিদিন মানুষ এখানে আসেন। কিন্তু আদালত চত্বরে গণশৌচাগার না থাকায় বাদী-বিবাদী ও বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। জরুরি ভিত্তিতে গণশৌচাগার নির্মাণের পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
স্থানীয় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের দাবি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী চিকন্দী আদালতের পুরোনো স্থাপনা সংরক্ষণ, জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, প্রয়োজনীয় নতুন ভবন নির্মাণ এবং নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। ১৫৫ বছর পরও ঠিকানা না বদলানো আদালতটি যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকে, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা।