চীনা স্মার্ট গাড়িতে ধরা পড়ল নরওয়ের সেনাদের স্পর্শকাতর তথ্য
ছবি সংগৃহীত।
চীনে তৈরি স্মার্ট গাড়িতে নরওয়ের সামরিক বাহিনীর স্পর্শকাতর তথ্য ধারণের ঘটনা সামনে এসেছে। গাড়ির ক্যামেরায় সেনাসদস্যদের ওঠানামা, তাদের চলাচলের পথ এবং সামরিক স্থাপনায় প্রবেশের গেট ও দরজার কোডও ধরা পড়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, এসব তথ্য অন্য কারও কাছে, বিশেষ করে চীনে, পাঠানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নরওয়ের সংবাদপত্র দাগেনস নেরিংসলিভ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর অসলো বিমানবন্দরে সামরিক বাহিনীর এক নিরাপত্তা মহড়া চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। গাড়িতে অপেক্ষা করার সময় সেনাসদস্যেরা এর পর্দায় ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও দেখতে পান। নরওয়ের হোম গার্ডের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল পের গুনার গ্রোসবার্গহাউগেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, হোম গার্ডের সদস্যরা গাড়ির সেন্সরে ধারণ করা ভিডিও পেয়েছিলেন। তবে এসব তথ্য তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়িগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত দুটি ছিল চীনা গাড়ি নির্মাতা চ্যাংআনের তৈরি ডিপাল ব্র্যান্ডের গাড়ি। সেনাবাহিনীকে গাড়িগুলো সরবরাহ করেছিল হার্টজ নরওয়ে। প্রতিষ্ঠানটির পরোক্ষ মালিকানা চীনা গাড়ি নির্মাতা গিলির হাতে।
বিকল্প না থাকায় গাড়ি ব্যবহার অব্যাহত :
ক্যামেরায় স্পর্শকাতর তথ্য ধারণের বিষয়টি জানার পরও বিকল্প গাড়ি না থাকায় মহড়া শেষ হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ব্যবহার করে সামরিক বাহিনী। পরে সেনাসদস্যেরা ভিডিওগুলো মুছে দেন। চীনে তৈরি সব গাড়ি নিষিদ্ধ করলে নিরাপত্তার সম্ভাব্য সুফলের তুলনায় এর প্রভাব বেশি হতে পারে বলে মনে করছে নরওয়ের সামরিক বাহিনী।
তাই সব চীনা গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞার বদলে নির্দিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে তারা। প্রয়োজনে ক্যামেরা ও সেন্সরযুক্ত গাড়ি—সেগুলো যে দেশেই তৈরি হোক—কিছু স্থানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে।
হার্টজ নরওয়ের বিপণন ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক হালভার্ড নেরবোভিক বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি নরওয়ে ও ইউরোপের আইন মেনে চলে। আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য গাড়ি নির্মাতা, মালিক বা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে ভাগ করা হয় না বলেও জানান তিনি। তবে ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও অন্য কোথাও পাঠানো হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি চ্যাংআন গ্রুপ।
‘চলন্ত কম্পিউটার’ হয়ে উঠছে গাড়ি :
নরওয়ের এ ঘটনা আধুনিক গাড়ির তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ক্যামেরা, সেন্সর ও ইন্টারনেট-সংযুক্ত প্রযুক্তির কারণে গাড়ি এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি বিপুল তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারে।
গত বছর অসলো অঞ্চলের গণপরিবহন কর্তৃপক্ষ রুটারের জন্য চালানো এক পরীক্ষায় দেখা যায়, চীনা প্রতিষ্ঠান ইউটংয়ের তৈরি বৈদ্যুতিক বাস দূর থেকে সফটওয়্যার হালনাগাদের ব্যবস্থার মাধ্যমে তাত্ত্বিকভাবে অচল করে দেওয়া সম্ভব। জরুরি পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে সরিয়ে নিতে এসব বাস ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে নরওয়ের। রুটার জানিয়েছে, এরপর থেকে দূর থেকে আসা সংকেত পর্যবেক্ষণ এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ বিলম্বিত করার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
গাড়ির বাইরেও স্মার্টঘড়ি ও স্ট্রাভার মতো শরীরচর্চার অ্যাপ থেকে সামরিক বাহিনীর স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশিত হওয়ার নজির রয়েছে। ২০১৮ সালে স্ট্রাভায় প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে আফগানিস্তান ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে সামরিক স্থাপনা এবং সেনাদের চলাচলের পথ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে ফরাসি সংবাদপত্র লে মোঁদ স্ট্রাভা ব্যবহারকারী এক নাবিকের তথ্যের ভিত্তিতে ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে ফ্রান্সের বিমানবাহী রণতরি শার্ল দ্য গলকে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছিল।
নরওয়ের জাতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা আন্দ্রেয়াস স্কজোল্ড-লোরাঞ্জ আধুনিক গাড়িকে ‘চলন্ত কম্পিউটার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, এসব গাড়ি কী তথ্য সংগ্রহ করছে, সেই তথ্য কোথায় পাঠানো হচ্ছে এবং কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা নেই।
তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকির পাশাপাশি কোনো একটি দেশের পণ্য বা সেবার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিষয়েও সতর্ক করেছে নরওয়ের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, নিরাপত্তার বিষয়ে সহযোগিতা করে না—এমন কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।