ইসলামের দৃষ্টিতে গুজব ও মিথ্যা খবর প্রচার জঘন্য পাপ

ইসলামের দৃষ্টিতে গুজব ও মিথ্যা খবর প্রচার জঘন্য পাপ

ফাইল ছবি

বর্তমান সভ্যতায় তথ্য-প্রযুক্তির ঈর্ষণীয় অগ্রগতি মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজকে সহজতর করেছে। নিমিষেই যেকোনো খবর, তথ্য বা বিবরণ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

সেই খবর সত্য হোক, মিথ্যা হোক বা অপপ্রচার হোক, তা মানুষ জেনে যাচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনজনের সব তথ্য যেমন জানতে পারছে, তেমনি তথ্যকে জানাতেও পারছে। ফলে মানুষের জীবন সহজ ও সাবলীল হয়েছে। এরই সঙ্গে স্বার্থান্বেষী মহলের ভুল তথ্য, মিথ্যা খবর, গুজব, অপপ্রচার ও অপব্যাখ্যা সমাজের মধ্যে ভয়ভীতি, বিরোধ, কলহ এবং সামাজিক বন্ধনকে অসহনীয় করে তুলছে।

এ কথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে গুজব ও অপতথ্যে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে মানুষের মধ্যে শোবা-সন্দেহ, পারস্পরিক সম্পর্ক—হোক সেটা পারিবারিক বা সামাজিক, তা কঠিন সংকটের মধ্যে পড়েছে। অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ ও তথ্যের ছড়াছড়ি এতটাই বেড়েছে যে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে কোনো মানুষ, সমাজ, এমনকি রাষ্ট্রও নিরাপদ নয়। এই সমস্যা তথাকথিত আধুনিক দুনিয়ার প্রতিটি দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র ও মানবসভ্যতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

তাই এই সংকটের প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমাজবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে রাশিয়ার সমাজবিজ্ঞানী গ্যারি ক্যাসপারভ বলেন, ‘আধুনিক প্রচারণার উদ্দেশ্য শুধু আপনাকে ভুল তথ্য দেওয়া বা কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়া নয়, এর মূল উদ্দেশ্য হলো আপনার ভেতরের সমালোচনামূলক চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতাকে ক্লান্ত করে দেওয়া এবং সত্যকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করা।’ 

বিশ্বখ্যাত স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল কাস্টেলস বলেন, ‘অপপ্রচার যখন চালানো হয়, তখন প্রথাগত গনমাধ্যমকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়। এর ফলে পুরো সমাজে এক ধরনের যোগাযোগ সংকট তৈরি হয় এবং মানুষ চরমপন্থী ও কাল্পনিক ষড়যন্ত্রতত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে।’

খ্যাতনামা ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী জঁ বদ্রিলার আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘অপপ্রচারের মূল কথা হলো এখানে সত্যের কোনো দাম নেই।

তথ্যের নকল বা প্রতিরূপই মানুষের কাছে আসল সত্য হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে সমাজে বস্তুনিষ্ঠ সত্য এবং নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটে, কারণ মানুষ আর আসল ও নকলের তফাত করতে পারে না।’

সত্যিকথা বলতে কি—গুজব ও অপপ্রচারের ব্যাপকতা গোটা বিশ্বের সুস্থ সভ্যতা ও ভব্যতার মূলে কুঠারাঘাত করেছে। আমাদের এই বাংলাদেশেও এর ভয়াবহ প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত যেসব গুজব, অপতথ্য, অপপ্রচার প্রকাশ করা হচ্ছে, তাতে এ দেশের সামাজিক সম্প্রীতি ও ব্যক্তি সম্পর্ক জটিল আবর্তে প্রবেশ করেছে। 

আজকাল এই ভয়াবহ গুজব ও অপপ্রচার নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন হলেও এর গতিরোধ করার উপায় কারো জানা নেই। অথচ ইসলাম এ ধরনের গুজব, মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। গুজব তৈরি ও ছড়ানোকে ইসলামে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও জাতিকে গুজবের ভয়ানক পরিণতি থেকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন কঠোর আইন, আইনের প্রয়োগ, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা।

বাংলা শব্দ ‘গুজব’-এর আরবি প্রতিশব্দ ‘ইশায়াতুন’। এর অর্থ রটনা বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, যেই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। জনসাধারণ সম্পর্কিত কোনো বিষয়, ঘটনা, তথ্য বা ব্যক্তি নিয়ে অমূলক, বিকৃত বা গল্পকে বলা হয় গুজব। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় গুজব হলো এমন একটি বিবৃতি, যার সত্যতা নিশ্চিত করা বা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। গুজব মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এবং তার সম্মানহানি ঘটায়। তাই ইসলাম এই পাপ বা অপরাধ সর্বতোভাবে পরিহার করার কথা বলেছে। 

সংবাদ বা তথ্য মিথ্যা হোক বা সত্য হোক, অনেকে তা যাচাই-বাছাই না করেই প্রচার করে দেয়। এটাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনে তা বলে বেড়ায়।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৯২)

অনেক সংবাদ বা তথ্যের সঙ্গে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জড়িত থাকে। তাই যেকোনো মিথ্যা সংবাদ বা গুজব মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য করে এবং কখনো কখনো তা ব্যক্তি কিংবা সমাজ ও রাষ্ট্রের বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনে। তাই এ ধরনের সংবাদ পরিবেশনা বা প্রচারের বেলায় তা যথাযথ যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো। অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

একই কথা কোরআনের অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান (জানা) নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তরের প্রতিটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩৬)

নেতিবাচক খবর, সংবাদ বা তথ্য যখন কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ছড়ানো হয়, তখন ব্যক্তির অগোচরে তার সম্পর্কে মানুষের মনে খারাপ ধারণার সৃষ্টি করা হয়, যা জানতে পারলে ওই ব্যক্তি অপমানিত হন। এটি পরনিন্দা বা গিবতের পর্যায়ে পড়ে। শরিয়তে গিবত একটি জঘন্য অপরাধ হিসেবে পরিগণিত। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের দোষচর্চা (গিবত) কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারো পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? নিশ্চয়ই তা অপছন্দ করবে। তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২) 

ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার আমাদের সমাজে মহামারির আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এটাকে প্রতিপক্ষ দমনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি অথবা কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো দলকে জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করতে অপপ্রচারের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে কারো বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে তার সম্মানহানি করা একটি জঘন্য পাপ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভুল করে কিংবা কোনো পাপ করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি অপবাদ আরোপ করে, সে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১৩) 

অপতথ্য, মিথ্যা খবর বা গুজব ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সত্যকে গোপন করা এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করা, যাতে মানুষ আতঙ্কিত হয়। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়ানোকে ইসলামে মুনাফিকের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে রটনাকারী বা গুজব ছড়ানোকারীর মধ্যে মুনাফিকের দুটি লক্ষণ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একটি হলো মিথ্যা বলা, অন্যটি হলো আমানতের খিয়ানত করা। মুনাফিকের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে এবং আপনি কখনোই তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবেন না।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৪৫)

মুনাফিকের আরেকটি চরিত্র হলো সে ভালো কথা বলবে, কিন্তু নিজে করবে না, মন্দ থেকে নিষেধ করবে, কিন্তু সে তা নিজে করবে। এর ফলে মানুষ তার দ্বারা বিভ্রান্ত হয় এবং সত্য-মিথ্যা নিয়ে তার মধ্যে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়।
অপতথ্য ও অপপ্রচার বা গুজবের এই মহামারির যুগে আমাদের নিজেদের সুরক্ষা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য সবার উচিত সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। 

সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তাতে আক্রান্ত না হওয়ার জন্য সচেষ্ট থাকা। একই সঙ্গে সেটি প্রসারে সহযোগিতা না করা; বরং এ ধরনের তথ্যকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের গোটরীভূত করা। এমন নির্দেশ কোরআনে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেন, ‘যখন তাদের কাছে ভয়ের বা নিরাপত্তার কোনো সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা তা প্রচার করে। যদি তারা তা রাসুল বা তাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর করত, তবে তাদের অনুসরণকারীরা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ না থাকত, তবে সামান্য সংখ্যক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)

এই আয়াতের মর্ম হলো সংবাদ যাচাই না করে তার প্রতি আস্থা রাখা যাবে না। আর সেটি তো প্রচার করার ব্যাপারেও সতর্ক হতে হবে। কারণ গুজব বা অপতথ্য রটানো শয়তানের কাজ। আর শয়তান আমাদের চরম শত্রু। এ কথাই এক হাদিসে উল্লেখ করেছেন রাসুল (সা.)। তিনি বলেন, ‘শয়তান মানুষের রূপ ধরে তাদের কাছে আসে এবং তাদের মিথ্যা কথা শোনায়। অতঃপর লোকজন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের কেউ বলে, আমি এমন ব্যক্তিকে এ কথা বলতে শুনেছি, যার চেহারা চিনি, কিন্তু নাম জানি না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭)

তাই শয়তানের ফাঁদ থেকে বাঁচতে আমাদের অধিকতর সতর্ক হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অপতথ্যের এই যুগে প্রয়োজন ছাড়া কোনো কথা না বলা বা কোনো কথা প্রচার না করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।’ (জামে আত-তিরমিজি : ২৫০১)

তা ছাড়া কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে অপপ্রচারকারী বা গুজব রটনাকারীকে চিহ্নিত করা এবং এর প্রতিরোধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের গুজব বা অপপ্রচারের ভয়াবহ পাপ ও পরিণতি থেকে রক্ষা করুন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও বিশ্লেষক