ক্যান্সার ধরা পড়ার পর মানসিক শক্তি ফেরাতে কী করবেন

ক্যান্সার ধরা পড়ার পর মানসিক শক্তি ফেরাতে কী করবেন

ফাইল ছবি

ক্যান্সার ধরা পড়ার পর অনেকের মনেই প্রথমে অবিশ্বাস, ভয় আর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। চিকিৎসা কীভাবে চলবে, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন হবে, পরিবারকে কীভাবে সামলাবেন—এমন নানা চিন্তা একসঙ্গে ভর করতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ও ওষুধের পাশাপাশি এই সময় মানসিক চাপ সামলানো এবং আত্মবিশ্বাস ধরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউন্সেলিং বা মানসিক পরামর্শ ক্যান্সার রোগীদের ভয়, দুশ্চিন্তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং চিকিৎসাজনিত মানসিক ক্লান্তি মোকাবেলায় সহায়তা করতে পারে। এর উদ্দেশ্য সব সময় ইতিবাচক থাকা নয়; বরং নিজের অনুভূতিগুলো বুঝতে শেখা এবং কঠিন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় খুঁজে পাওয়া। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানায়।

রোগ নির্ণয়ের পর অবিশ্বাস তৈরি হওয়া স্বাভাবিক
ঢাকার মনোবিকাশ ফাউন্ডেশনের সাইকোথেরাপিস্ট আবদুল হামিদের মতে, ক্যানসার ধরা পড়ার পর অনেকের মধ্যে প্রথমে বিষয়টি মেনে নিতে না পারা বা অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়। ‘আমার সঙ্গে এমনটা কীভাবে হলো’—এমন চিন্তা বড় ধাক্কা সামলানোর একটি প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

এ সময় নিজেকে জোর করে শক্ত থাকার বা সব সময় ইতিবাচক থাকার চাপ দেওয়া ঠিক নয়। ভয়, রাগ, দুঃখ কিংবা অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকা জরুরি।

কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে রোগীরা বিচারহীন ও নিরাপদ পরিবেশে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন।
ভয় ও দুশ্চিন্তা সামলাতে সাহায্য নিন
ক্যান্সারের চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা, চিকিৎসা নিয়ে সিদ্ধান্ত এবং হাসপাতালে নিয়মিত যাতায়াত—সব মিলিয়ে ক্লান্তি বাড়তে পারে।
 
কাউন্সেলর বা মনোবিজ্ঞানী রোগীর কোন বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভয় বা দুশ্চিন্তা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারেন। এরপর উদ্বেগজনক চিন্তা সামলানো, নেতিবাচক ভাবনার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা এবং দৈনন্দিন কাজের গতি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ঠিক করার মতো কৌশল শেখানো হতে পারে।

প্রথম দিনেই সব কথা বলতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে কথা বলেও সহায়তা নেওয়া যায়।

শারীরিক পরিবর্তনে আত্মবিশ্বাস হারাবেন না
ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় শরীরে নানা পরিবর্তন আসতে পারে। এসব পরিবর্তনের কারণে কেউ কেউ নিজের চেহারা নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগেন এবং বন্ধু, আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা করা এড়িয়ে চলেন।

আবদুল হামিদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে কাউন্সেলিং আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং অন্যদের সামনে স্বচ্ছন্দ বোধ করতে সাহায্য করতে পারে। রোগীর প্রচেষ্টা ও সাহসকে স্বীকৃতি দেওয়া, চিকিৎসায় অংশ নেওয়ার মতো ছোট অগ্রগতিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা—এসব তার নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রোগীকে সব সময় সাহসী বা হাসিখুশি থাকতে হবে। খারাপ লাগা বা ক্লান্ত বোধ করার অধিকারও তার রয়েছে।

পরিবার ও কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন
ক্যান্সার শুধু রোগীর জীবনেই নয়, পরিবারের সম্পর্কেও পরিবর্তন আনতে পারে। সঙ্গী বা পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যার দায়িত্ব বাড়তে পারে, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিবর্তন আসতে পারে এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগও কমে যেতে পারে। চিকিৎসা শেষে কাজে ফেরার সময় কর্মক্ষেত্রে নিজের শারীরিক সক্ষমতা বা অসুস্থতার কথা কতটা জানাবেন, তা নিয়েও দ্বিধা তৈরি হতে পারে।
 
এসব বিষয় চেপে না রেখে বিশ্বস্ত মানুষ কিংবা কাউন্সেলরের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদেরও রোগীর অনুভূতি মন দিয়ে শোনা এবং তাঁকে সব সময় ‘ইতিবাচক’ থাকার পরামর্শ না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পাশে থাকা জরুরি।

চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক যত্নও গুরুত্বপূর্ণ
ক্যান্সার রোগীর মানসিক সুস্থতা ধরে রাখতে প্রতিদিনের কাজ নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী সাজানো, বিশ্রাম নেওয়া এবং কাছের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সহায়ক হতে পারে। উদ্বেগ বা মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হলে কিংবা পরিস্থিতি সামলানো কঠিন মনে হলে মনোবিজ্ঞানী, সাইকোথেরাপিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কাউন্সেলিং ক্যান্সারের রোগ নির্ণয় বদলে দিতে পারে না এবং এটি চিকিৎসার বিকল্পও নয়। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক সহায়তা রোগীকে ভয় ও অনিশ্চয়তা সামলাতে, নিজের অনুভূতি বুঝতে এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের অর্থ সব সময় শক্ত থাকার ভান করা নয়। প্রয়োজনের সময়ে সাহায্য চাওয়া, নিজের কষ্ট প্রকাশ করা এবং ধাপে ধাপে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও মানসিক শক্তির অংশ।