ভাইয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ, দোয়া কি কবুল হবে?

ভাইয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ, দোয়া কি কবুল হবে?

ফাইল ছবি

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা পুরোনো অভিমানে আপন ভাইয়ের সঙ্গেও কথা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন মনে প্রশ্ন আসে, এ অবস্থায় আল্লাহ কি আমার দোয়া শুনবেন? ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ কি ক্ষমা লাভের পথে বাধা হতে পারে?

ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ থাকলেই সব দোয়া কবুল হবে না, এমন নয়। তবে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখার কারণে ক্ষমা লাভে বাধা তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

দোয়া নিয়ে হাদিসের সতর্কতা

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে কোনো গুনাহের কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে এবং দোয়া কবুলে তাড়াহুড়া করে। জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল (স.), দোয়া কবুলে তাড়াহুড়া করা বলতে কী বোঝায়?’ তিনি বললেন, ‘বান্দা বলতে থাকে, আমি দোয়া করেছি, অথচ আমার দোয়া কবুল হতে দেখিনি। এরপর সে হতাশ হয়ে পড়ে এবং দোয়া করা ছেড়ে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫)

অর্থাৎ, গুনাহের কাজ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দোয়া করা অনুচিত। তবে ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ থাকলেই প্রতিটি দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয়, এমন নয়। নিজের ভুল সংশোধন করা এবং বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করাই করণীয়।

তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ রাখা কি জায়েজ?

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো মুসলিমের জন্য তার অপর মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকা বৈধ নয়। তাদের দেখা হলে একজন এদিকে, অন্যজন ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের মধ্যে যে আগে সালাম দেয়, সেই উত্তম। (সহিহ বুখারি: ৬০৭৭)

হাদিসটি পারস্পরিক রাগ ও অভিমানের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। আপন ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধ হলেও দীর্ঘদিন কথা বন্ধ করে রাখা উচিত নয়। সম্ভব হলে আগে সালাম দিয়ে যোগাযোগ শুরু করুন এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করার উদ্যোগ নিন।

বিরোধ কি ক্ষমা লাভের পথে বাধা হতে পারে?

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার জান্নাতের দরজা খোলা হয়। আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে না, এমন বান্দাদের ক্ষমা করা হয়। তবে যাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা বা বিদ্বেষ রয়েছে, তাদের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তাদের বিষয়টি স্থগিত রাখা হয়। (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৫)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক বিদ্বেষ পুষে রাখা গুরুতর বিষয়। ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলে তা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। নিজের ভুল থাকলে ক্ষমা চাওয়া এবং অন্যায়ভাবে কারও অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি। 

আয়েশা (রা.)-এর ঘটনা ও শিক্ষা

উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তার ভাগনে আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রা.)-এর একবার মনোমালিন্য হয়। আয়েশা (রা.)-এর দান-খয়রাত নিয়ে আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রা.) আপত্তি জানানোর পর তিনি তার সঙ্গে আর কথা না বলার মানত করেন। বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রা.) মিসওয়ার ইবনু মাখরামা ও আবদুর রহমান ইবনুল আসওয়াদকে মধ্যস্থতার অনুরোধ জানান। তারা আয়েশা (রা.)-কে স্মরণ করিয়ে দেন, রাসুলুল্লাহ (স.) তিন দিনের বেশি সম্পর্ক ছিন্ন করে থাকতে নিষেধ করেছেন। অবশেষে আয়েশা (রা.) তার সঙ্গে কথা বলেন এবং মানতের কাফফারা হিসেবে চল্লিশজন দাস মুক্ত করেন। পরে মানতের কথা মনে পড়লে তিনি এত কাঁদতেন যে তার ওড়না চোখের পানিতে ভিজে যেত। (সহিহ বুখারি: ৬০৭৩)

ঘটনাটি থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, বিরোধ দীর্ঘায়িত না করে মীমাংসার চেষ্টা করা উচিত। প্রয়োজনে মধ্যস্থতার সাহায্য নিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণতি

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)

এটি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী। তাই সম্পত্তি, অর্থ কিংবা ব্যক্তিগত অভিমানের কারণে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার আগে নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা উচিত। তবে এ হাদিসের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আখেরাতের পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।

সম্পর্ক ঠিক করতে কী করবেন?

আগে সালাম দিন: ভাই আগে যোগাযোগ করবেন, এমন অপেক্ষায় না থেকে নিজেই সালাম দিয়ে কথা শুরু করুন। সরাসরি কথা বলা কঠিন হলে ফোন বা বার্তার মাধ্যমে খোঁজ নিতে পারেন।

নিজের ভুল স্বীকার করুন: বিরোধে নিজেরও দায় থাকলে তা মেনে নিন। আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করুন এবং ক্ষমা চান।

অধিকার নিয়ে বিরোধ মেটান: সম্পত্তি বা উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ থাকলে ন্যায্য সমাধান করুন। কারও প্রাপ্য অধিকার আটকে রেখে শুধু মুখে সম্পর্ক ঠিক করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেম বা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সাহায্য নিন।

ক্ষমার মনোভাব রাখুন: ভাইয়ের আচরণে কষ্ট পেলে তা অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। তবে প্রতিশোধের মনোভাব পুষে না রেখে সম্ভব হলে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উদারতা প্রদর্শন করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন?’ (সুরা নূর: ২২)

দোয়া অব্যাহত রাখুন: বিরোধ আছে বলে দোয়া ছেড়ে দেবেন না। নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চান, অন্তর নরম করে দেওয়ার প্রার্থনা করুন এবং ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করুন। পাশাপাশি সম্পর্ক ঠিক করতে বাস্তব পদক্ষেপ নিন।

তবে নির্যাতন, হুমকি বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকলে নিজের সুরক্ষার জন্য দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন হতে পারে। সম্পর্ক রক্ষার অর্থ অন্যায় সহ্য করা নয়। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ উপায়ে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা উচিত।

ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন থাকলেই সব দোয়া কবুল হবে না, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, পারস্পরিক বিদ্বেষ দূর করা এবং অন্যের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করা উচিত।

তথ্যসূত্র: সুরা নিসা: ১; সুরা নূর: ২২; সহিহ মুসলিম: ২৭৩৫, ২৫৬৫; সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪, ৬০৭৩, ৬০৭৭