সংবিধান সংশোধন কমিটির সভা বর্জন করলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম
ছবি সংগৃহীত।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে- এমন অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা বর্জন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম।
তার দাবি, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের উদ্যোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ অবস্থানের কথা জানান তিনি। একই সঙ্গে ডাকসুর পক্ষ থেকেও ওই মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যানের কথা জানান সাদিক কায়েম।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, মঙ্গলবার বেলা ২টা ৩০ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠেয় ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র মতবিনিময় সভায় ডাকসুর ভিপি হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি বিবেচনায় তিনি ও ডাকসু এ সভা বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সাদিক কায়েম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। নামমাত্র কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়নি। সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার এক বিষয় নয়।
তিনি বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করতে পারে। তবে এ ক্ষমতার মাধ্যমে বিদ্যমান সংবিধান ও এর মৌলিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে অতীতের কয়েকটি সাংবিধানিক সংশোধনীর উদাহরণ তুলে ধরেন ডাকসু ভিপি। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা হলেও ২০০৫ সালে হাইকোর্ট এবং ২০১০ সালে আপিল বিভাগ সংশোধনীটি অবৈধ ঘোষণা করেন। একইভাবে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ছয়টি স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চের বিধান ১৯৮৯ সালে বাতিল হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও ২০১১ সালে আদালতের মাধ্যমে বাতিল হয়েছিল।
জুলাই জাতীয় সনদের বিভিন্ন প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতার আশঙ্কা প্রকাশ করেন সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পরিবর্তন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ সীমিত করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের কাঠামোগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাবের কয়েকটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে সরাসরি স্পর্শ করে। ফলে কেবল ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে সংশোধনীর মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে আদালতে চ্যালেঞ্জের ঝুঁকি থাকবে।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, জুলাইয়ের সংস্কার আকাঙ্ক্ষা এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে আইনগতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত গাঠনিক সংস্কারপ্রক্রিয়া প্রয়োজন। সংস্কারকে কেবল সংসদীয় সংশোধনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অবস্থান বৃহত্তর গণআকাঙ্ক্ষাকে সংকুচিত করছে। বর্তমান সরকারের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে তিনি জাতির সঙ্গে প্রতারণা এবং নির্বাচন-পূর্ববর্তী অঙ্গীকারের বরখেলাপ বলে উল্লেখ করেন।
গণভোটের ফলাফল তুলে ধরে সাদিক কায়েম বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে দেশের ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছেন। এমন সুস্পষ্ট গণরায় থাকার পরও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগে তিনি ও ডাকসু সম্পৃক্ত থাকবেন না।
বিবৃতির শেষাংশে, রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের পরিবর্তে গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদের আলোকে অবিলম্বে একটি স্বাধীন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানান ডাকসু ভিপি।