মা-বাবার যেসব অধিকার আমরা প্রায়ই ভুলে যাই

মা-বাবার যেসব অধিকার আমরা প্রায়ই ভুলে যাই

ফাইল ছবি

মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা শুধু মুখের কথা নয়। তাদের সম্মান করা, সময় দেওয়া, প্রয়োজন পূরণ করা এবং জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে পাশে থাকাও সন্তানের দায়িত্ব। মা-বাবাকে ভালোবাসে না, এমন সন্তান খুব কমই পাওয়া যায়। কিন্তু ভালোবাসার কথা বলা আর ভালোবাসার দাবি পূরণ করা এক বিষয় নয়। ঈদে নতুন জামা কিনে দেওয়া, মাস শেষে টাকা পাঠানো কিংবা অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা- এসবের গুরুত্ব আছে। তবে মা-বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব এর চেয়েও বিস্তৃত।

সন্তানের জন্য মা-বাবা জীবনের অনেক কিছু ত্যাগ করেন। মা গর্ভধারণের কষ্ট সহ্য করেন, প্রসবের যন্ত্রণা ভোগ করেন এবং রাতের পর রাত জেগে সন্তানের যত্ন নেন। বাবা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেন। অথচ বড় হওয়ার পর অনেক সন্তান ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নানা কারণে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন।

ইসলামে মা-বাবার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করতে। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের উফ (বিরক্তিসূচক কথা) বলো না, তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৩)

মা-বাবার এমন কয়েকটি অধিকার রয়েছে, যেগুলো আমরা প্রায়ই ভুলে যাই।

১. সম্মানজনক কথা ও সুন্দর আচরণ

মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর উঁচু করা, বিরক্তি প্রকাশ করা কিংবা ধমকের সুরে কথা বলা যাবে না। তারা কোনো কথা বারবার বললেও ধৈর্য ধরে শুনতে হবে। বয়সের কারণে তারা ভুলে গেলে বা কোনো কাজে ধীরগতি দেখালে বিরক্ত হওয়া যাবে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের সামনে দয়া ও নম্রতার সঙ্গে বিনয়ের ডানা অবনত করে দাও।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৪)

আজকের দিনে এই নির্দেশের বাস্তব প্রয়োগ হতে পারে- মা-বাবা ফোনে একই কথা বারবার বললে বিরক্ত না হওয়া, স্মার্টফোন ব্যবহারে ভুল করলে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দেওয়া কিংবা তাদের মতের সঙ্গে অমিল হলেও অসম্মানজনক কথা না বলা। এসব আচরণ মা-বাবার হক আদায়ের অংশ।

২. তাদের সময় দেওয়া ও খোঁজখবর রাখা

মা-বাবার প্রতি সদাচরণ শুধু আর্থিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, মন দিয়ে কথা শোনা এবং নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়াও সন্তানের দায়িত্ব।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৭১)

অনেক মা-বাবা সন্তানের একটি ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। বিশেষ করে দূরে বা প্রবাসে থাকা সন্তানদের উচিত নিয়মিত তাদের খোঁজ নেওয়া। শুধু টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করা ঠিক নয়। প্রতিদিনের একটি ফোন, কিছুক্ষণ মন খুলে কথা বলা কিংবা তাদের পুরোনো গল্প মন দিয়ে শোনাও তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

৩. ভরণপোষণ ও আর্থিক সহযোগিতা

মা-বাবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে এবং সন্তানের সামর্থ্য থাকলে তাদের প্রয়োজন পূরণ করা সন্তানের দায়িত্ব। খাবার, পোশাক, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা কী ব্যয় করবে সে সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করে। বলুন, যে ধন-সম্পদ তোমরা ব্যয় করবে তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন এবং মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা বাকারা: ২১৫)

তবে আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি দেওয়ার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। টাকা দিয়ে খোঁটা দেওয়া, ভাইবোনদের সঙ্গে তুলনা করা কিংবা প্রয়োজনের কথা বলতে মা-বাবাকে সংকোচে ফেলে দেওয়া উচিত নয়। সহযোগিতা করতে হবে সম্মান ও আন্তরিকতার সঙ্গে।

৪. মা-বাবার ন্যায়সংগত নির্দেশকে গুরুত্ব দেওয়া

মা-বাবার বৈধ ও ন্যায়সংগত নির্দেশ মানা সন্তানের দায়িত্ব। তাদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া এবং যথাসম্ভব মনঃক্ষুণ্ন না করে চলার চেষ্টা করতে হবে। তবে তারা কোনো গুনাহের নির্দেশ দিলে তা মানা যাবে না। আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কারও আনুগত্য করা বৈধ নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা যদি তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুকে শরিক করতে বাধ্য করে, যার বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তাদের কথা মানবে না। তবে দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করবে।’ (সুরা লুকমান: ১৫)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, কোনো বিষয়ে মা-বাবার কথা মানা সম্ভব না হলেও তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করা যাবে না। মতভেদ থাকলেও সম্মান ও সুন্দর আচরণ বজায় রাখতে হবে।

৫. অসুস্থতা ও বার্ধক্যে সেবা করা

মা-বাবা অসুস্থ হলে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বার্ধক্যে দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনের সময় পাশে থাকা সন্তানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তারা যখন নিজের কাজ নিজে করতে পারেন না, তখন তাদের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে।

আল্লাহ তাআলা মায়ের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে।’ (সুরা লুকমান: ১৪)

শৈশবে সন্তান নিজের প্রয়োজনের জন্য মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তারা বিরক্ত না হয়ে সন্তানের যত্ন নিয়েছেন। তাই বার্ধক্যে মা-বাবার সেবা করতে গিয়ে বিরক্ত হওয়া বা তাদের বোঝা মনে করা যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘নাক ধূলিমলিন হোক, নাক ধূলিমলিন হোক, নাক ধূলিমলিন হোক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কে সেই ব্যক্তি?’ তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার মা-বাবা উভয়কে কিংবা তাদের একজনকে বার্ধক্যজনিত অবস্থায় পেল, এরপরও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৫১)

এই হাদিসে বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা করার সুযোগকে জান্নাত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অথচ অনেক সন্তান এই সুযোগের মূল্য বোঝেন না। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মা-বাবার সেবা না করা এবং তাদের প্রয়োজন উপেক্ষা করা গুরুতর অবহেলা।

৬. তাদের জন্য দোয়া করা

মা-বাবার জীবদ্দশায় তাদের কল্যাণ, সুস্থতা ও ক্ষমার জন্য দোয়া করতে হবে। তাদের মৃত্যুর পরও দোয়া বন্ধ করা যাবে না।

আল্লাহ তাআলা মা-বাবার জন্য এই দোয়া শিখিয়েছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমন শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৪)

এই দোয়াটি প্রতিদিন পড়ার অভ্যাস করা উচিত। মা-বাবার জন্য দোয়া করা সন্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল।

৭. মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন

মা-বাবার মৃত্যুর সঙ্গে তাদের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাদের জন্য দোয়া করা, সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা, ঋণ থাকলে পরিশোধের ব্যবস্থা করা এবং শরিয়তসম্মত অসিয়ত পূরণ করা সন্তানের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-কে বললেন, তার মা হঠাৎ মারা গেছেন। তিনি যদি মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করেন, তাহলে কি মা এর সওয়াব পাবেন? রাসুলুল্লাহ (স.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ (সহিহ বুখারি: ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম: ১০০৪)

এ ছাড়া মা-বাবার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাও তাদের মৃত্যুর পর সদাচরণের অংশ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম সদাচরণের একটি হলো, পিতার মৃত্যুর পর তার বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।’ (সহিহ মুসলিম: ২৫৫২)

মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য সব সময় বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি ফোনকল, একটু সময়, নরম একটি কথা কিংবা প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানোই তাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। আর যাদের মা-বাবা ইন্তেকাল করেছেন, তারাও দোয়া, সদকা ও তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে সদাচরণ চালিয়ে যেতে পারেন। এই দায়িত্ব পালনের মধ্যেই রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ।

তথ্যসূত্র: সুরা বনি ইসরাইল: ২৩-২৪; সুরা বাকারা: ২১৫; সুরা লুকমান: ১৪-১৫; সহিহ বুখারি: ৫৯৭১, ১৩৮৮; সহিহ মুসলিম: ২৫৫১, ২৫৫২, ১০০৪