লবণাক্ত উপকূলে মিঠা পানির উৎস শনাক্ত

৩০ নভেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সুন্দরবন এলাকায় দুটি বিশাল মিঠাপানির উৎসের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।লবণাক্ততাকবলিত এই অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট নিরসনে এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলছেন গবেষকরা।

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ডেল্টার দক্ষিণ-পশ্চিমে পশুর নদী বরাবর এই গবেষণায় ভূগর্ভস্থ বৈদ্যুতিক রোধের তারতম্য নির্ণয়ে গভীর-সেন্সিং ম্যাগনেটোটেলুরিক (এমটি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভূ-পৃষ্ঠের শত শত মিটার নিচে ‘আর১’ ও ‘আর২’ নামে দুটি বড় মিঠাপানির স্তর শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এর মধ্যে বড়টি ‘আর১’ জরিপ লাইনের উত্তরে অবস্থিত এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এর গভীরতা প্রায় ৮০০ মিটার পর্যন্ত। দ্বিতীয়টি, ‘আর২’ তুলনামূলকভাবে অগভীর ও ছোট। এটি সুন্দরবনের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত এবং অনুরূপ দৈর্ঘ্যে অনুভূমিকভাবে বিস্তৃত হলেও গভীরতা সর্বোচ্চ ২৫০ মিটার পর্যন্ত।

বিজ্ঞানীরা এই সংরক্ষিত পানিকে ‘প্যালিওওয়াটার’ বা ‘প্রাচীন পানি’ বলে উল্লেখ করেছেন। শেষ বরফ (লাস্ট গ্লেশিয়াল ম্যাক্সিমাম) যুগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম থাকায় মিঠাপানি ভূগর্ভে জমা হয় এবং পরে কাদা ও শক্ত মাটির স্তরে ঢেকে প্রাকৃতিকভাবে সিলগালা হয়ে নোনাজলের মিশ্রণ থেকে সুরক্ষিত থাকে।

সদ্য আবিষ্কৃত এই গভীর জলাধারগুলো উপকূলীয় সাধারণ ভূগর্ভস্থ পানির চেয়ে আলাদা। কারণ, এগুলো প্রাচীন ও ভিন্ন পরিবেশগত পরিস্থিতিতে গঠিত হয়েছিল। এগুলো অত্যন্ত ধীরগতিতে পুনঃভরাট হয়। তাই একে নবায়নযোগ্য উৎসের চেয়ে একটি ‘সীমিত ভূতাত্ত্বিক সম্পদ’ হিসেবেই দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির বড় অংশই বর্তমানে লবণাক্ততার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চিংড়ি চাষ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির মৌসুমী সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। এছাড়া দেশের অনেক অভ্যন্তরীণ এলাকায় অগভীর স্তরের পানিতে আর্সেনিক থাকায় নিরাপদ পানির সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দুই মিঠাপানির স্তরের মাঝখানে ‘সি১’ নামের প্রায় ২০ কিমি-প্রস্থের এক লবণাক্ত অঞ্চল আছে। সুন্দরবনের উত্তরাঞ্চলের এই পরিবাহী স্তরটি শেষ বরফযুগের পুরোনো গঙ্গা খাতের সঙ্গে মিলে যায়। পরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে খাতটি সামুদ্রিক পলি ও নোনাজলে ভরে উঠে এবং দুই মিঠাপানির স্তরের মাঝে প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রাচীন ওঠানামা ও নদীখাতের ক্ষয়ের কারণে বিশ্বের অন্যান্য উপকূলীয় বদ্বীপেও এমন গভীর জলাধার থাকতে পারে—এই গবেষণা সে ধারণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে