০৪ জুলাই, ২০২৬
বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতে ভালোবাসত মিতু। কিন্তু হঠাৎ করেই চেনা অক্ষরগুলো চোখের সামনে ঝাপসা হতে শুরু করে। জানালার ওপারের কদম গাছটাও হারিয়ে যায় কুয়াশার মতো...এর পর থেকে চোখের এই ঝাপসা দৃষ্টি একটু একটু করে বাড়তেই থাকে। সেইসঙ্গে মাথাব্যথা তো রয়েছেই। চোখও কেমন শুষ্ক হয়ে যায়। এক অজানা আশঙ্কা গ্রাস করে ফেলে মিতুকে।
চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রথমবার “মায়োপিয়া” নামটি শোনে মিতু। যা চোখে কম দেখার একটি সমস্যা। এবং শুধু সে একা নয়, ইতোমধ্যে অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিইএইচও) মায়োপিয়াকে আধুনিক যুগের এক নীরব মহামারী বলে উল্লেখ করেছে। ২০১৫ সালের একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শত কোটি মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মায়োপিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
মায়োপিয়া বা চোখের ঝাপসা দৃষ্টির সমাধান চশমা। ছবি: সংগৃহীত
মায়োপিয়া কী
সহজ ভাষায় মায়োপিয়া অর্থ চোখের এমন একটি অবস্থা যেখানে কাছের বস্তু স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের জিনিস দেখতে চরম বেগ পেতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, স্বাভাবিক চোখের অক্ষিগোলকের আকৃতি যেমন থাকার কথা, মায়োপিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির অক্ষিগোলক তার চেয়ে কিছুটা লম্বা হয়ে যায়।
ফলে দূর থেকে আসা আলোক রশ্মি চোখের ভেতরের রেটিনায় সরাসরি আপতিত না হয়ে, তার কিছুটা সামনে গিয়ে মিলিত হয়। এই সামান্য দূরত্বের কারণেই মানুষের দেখার জগৎ পাল্টে ঝাপসা হয়ে যায়।
মায়োপিয়া কেন হয়
বংশগত কারণ বা বাবা-মায়ের এই সমস্যা থাকলে সন্তানের মায়োপিয়া হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে বর্তমানে আমাদের বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা এর চেয়েও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারাদিন চার দেয়ালের মাঝে বন্দি থাকা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখকে এই অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মায়োপিয়া আক্রান্ত এবং স্বাভাবিক চোখের গ্রাফ। ছবি: সংগৃহীত
মায়োপিয়া রোগের লক্ষণ
ঝাপসা দেখার পাশাপাশি অনবরত চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ সংকুচিত করে দেখার চেষ্টা করা এই রোগের প্রধান লক্ষণ।
মায়োপিয়া কি ভালো হয়
সঠিক চিকিৎসায় মায়োপিয়া ভালো হয়। বিজ্ঞানের কল্যাণে এই রোগের প্রতিষেধকও এখন আমাদের হাতের মুঠোয়।
সবচেয়ে সহজ এবং নিরাপদ সমাধান চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অবতল বা মাইনাস পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করা। এটি আলোকে ঠিক রেটিনায় ফোকাস করতে সাহায্য করে।
এছাড়া চশমা এড়াতে কন্টাক্ট লেন্স কিংবা আধুনিক ল্যাসিক সার্জারির মাধ্যমে প্রাপ্তবয়স্কদের চোখের কর্ণিয়ার আকৃতি স্থায়ীভাবে ঠিক করা সম্ভব।
মায়োপিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ছবি: সংগৃহীত
মায়োপিয়া প্রতিরোধের উপায়
চিকিৎসার চেয়েও জরুরি হলো সচেতনতা ও প্রতিরোধ। ডব্লিউএইও-এর পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের এই রোগ থেকে দূরে রাখতে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা বাইরের স্বাভাবিক আলোয় বা মাঠে খেলাধুলা করা উচিত।
একইসঙ্গে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় প্রতি ২০ মিনিট পর পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকানোর ‘২০-২০-২০ নিয়ম’ মেনে চলতে বলছেন চিকিৎসকরা।
চোখের যত্নে অবহেলা নয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।