বিজয় দিবস উদযাপনে মুখরিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: সংগৃহীত
১৬ই ডিসেম্বর, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে এই দিনে। দেশের প্রতিটি মহলে প্রতি বছরই দিনটি বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে। এবছর জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দিবসটি নতুন প্রাণ পেয়েছে। দেশব্যাপী দিনটিকে কেন্দ্র করে আনন্দের জোয়ার বইছে। দিবসটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও (ঢাবি) বিজয়ের সাজে সজ্জিত হয়েছে। ঢাবি প্রশাসনের নানা কর্মসূচি, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের বিজয় র্যালি এবং নানা আয়োজন দিবসটিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সোমবার সূর্যোদয় থেকেই তীব্র শীত উপেক্ষা করে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে রাজধানীর সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের উদ্দেশ্যে যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রশাসন এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর নানা কর্মসূচিতে দিনব্যাপী মুখরিত থাকে ঢাবি।
বিজয় দিবসে ঢাবি প্রশাসনের কর্মসূচি
নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন বিজয় দিবস উদযাপন করে। কর্মসূচির মধ্যে ছিলো: ভোরে উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবনসমূহে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে জমায়েত এবং উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ। এছাড়া, বিভিন্ন আবাসিক হলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্র প্রদর্শনী,চলচ্চিত্র প্রদর্শনী,প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বাঁধনের উদ্যোগে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষ্যে কলা ভবন, কার্জন হল, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ও স্মৃতি চিরন্তনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়।
বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিয়াসহ বিভিন্ন হল এবং আবাসিক এলাকার মসজিদে শহিদদের রুহের মাগফেরাত কামনা এবং দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য দোয়া করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য উপাসনালয়ে শহিদদের আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।
এছাড়া, ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ, নৃত্যকলা বিভাগ এবং থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের যৌথ ব্যবস্থাপনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
ছাত্রসংগঠনগুলোর বিজয় দিবস উদযাপন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠন গুলো নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করে।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন কয়েক হাজার ছাত্রজনতার উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার থেকে বিজয় র্যালি আয়োজন করে। এতে ছাত্র-জনতার সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধারাও যুক্ত হয়। নানা স্লোগানে ১৯৪৭,১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় গুলোকে স্মরণ করে তারা। আহবায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং সদস্য সচিব আরিফ সোহেলসহ অনেক নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাবি শাখার কেন্দ্র এবং হল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা প্রশাসনের সাথে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া নেতাকর্মীদের একাংশ রাজধানীর জিয়া উদ্যানে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে পুষ্পস্তবক দেওয়ার জন্য যায়।
এদিকে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে বিজয় দিবস উদযাপনে বিএনপি আয়োজিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টে ঢাবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যোগ দেয়।
বিজয় দিবস উপলক্ষে ঢাবি ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে মোজাফফর আহমেদ অডিটোরিয়ামে সাতচল্লিশ-একাত্তর-চব্বিশ: আমাদের বিজয়ের পরিক্রমা শিরোনামে' একটি আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়।
আলোচনা সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মির্যা গালিব, জাতীয় নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাবি শিবিরের সভাপতি মোঃ আবু সাদিক কায়েম।
সভায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের(বিএনপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির আআহবায়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও অসুস্থতা এবং ব্যস্ততার কারণে তারা উপস্থিত হতে পারেনি বলে জানা যায়।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের বিজয় র্যালিতেও ঢাবি শাখার নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেছে বলে জানান ঢাবি শিবিরের মিডিয়া সম্পাদক হোসাইন আহমদ জোবায়ের।
ইসলামি ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের ঢাবি শাখা সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজয় র্যালি বের করে। টিএসসি চত্ত্বর থেকে র্যালিটি শুরু হয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
র্যালিতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ মাহবুবুর রহমান নাহিয়ান, ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফ মুহাম্মাদ আলাউদ্দীন, ঢাবি সভাপতি ইয়াসিন আরাফাতসহ নেতাকর্মীদের অনেকে উপস্থিত ছিলেন প্রধান অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ মাহবুবুর রহমান নাহিয়ান।
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বিজয় দিবস উপলক্ষে সকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হওয়া মধুদার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এরপর সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। বিকেলে ঢাকা নগরের বিভিন্ন সাংগঠনিক এলাকায় আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বিজয় দিবসে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কর্মসূচির বিষয়ে সংগঠনটির ঢাবি সাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, মহান বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট’ সহ আমাদের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। আমরা অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মানের লড়াইকে এগিয়ে নিতে ছাত্র-জনতাকে সঠিক রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানাই। শেখ হাসিনা সহ গণহত্যায় জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাই, আহতদের সুনির্দিষ্ট তালিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসনের দাবি জানাই।'
টিএসসিভিত্তিক ক্লাবগুলোর আয়োজন
টিএসসিভিত্তিক ক্লাব গুলো বিজয় দিবস উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে স্মৃতিসৌধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যান্ড সোসাইটি (ডিউবিএস) টিএসসির পায়রা চত্বরে কন্সার্ট আয়োজন করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি বিজয় দিবস উপলক্ষে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে। এছাড়া অন্যান্য সংগঠনও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিজয় দিবস উদযাপন করে।
এছাড়া আসরের নামাজের পর বিপ্লবী ছাত্র পরিষদ নামে একটি সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে শহীদদের জন্য মিলাদের আয়োজন করে।
মহড়া নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন সন্ধ্যার পর স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে পথনাট্য প্রদর্শন করে।