বন্ধুর গন্তব্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
ফাইল ছবি।
বঙ্কিম চন্দ্রের "কপালকুণ্ডলা" উপন্যাসের অমর চরিত্র "কাপালিক" এর বিখ্যাত উক্তি "পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ" আজ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরোধী গোষ্ঠির মনের উক্তি! কিন্তু বাঙালী জাতির সহজাত প্রবৃত্তির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো "হৃদয়ে স্থান দেয়া আর হৃদয় থেকে মুছে দেয়া দুটোই ক্ষণস্থায়ী।" তাই আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের কর্মী সমর্থকরা বুক বেঁধে আছে আশির দশকের বিখ্যাত বাংলা ছবি "আনারকলি"র জনপ্রিয় গানের সূরে বললে "আমার মন বলে তুমি আসবে"।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ আসলেই জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সারির নেতৃবৃন্দের মুখে একটাই কথা যা দেবিদ্বারের কৃতি সন্তান ও গীতিকার লাকী আখন্দের সূরে বললে "পথের মাঝে পথ হারালে আর কি পাওয়া যায়?" তবে যে যাই বলুক ৫ ই আগস্টের পূর্বাপর ও পরবর্তী এক মাসে মানুষের নিকট আওয়ামী লীগের যে অবস্থান ছিল তা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে যা অবাক করার মত বিষয়। বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা "ভয়েস অব আমেরিকা" কর্তৃক পরিচালিত জনমত জরিপে জনগণের নিকট আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ গ্রহন যোগ্যতার প্রতিবেদন চিত্র দেখে দেশীয় বুদ্ধিজীবীদের টনক নড়েছে। সময়ের আলোচিত ইউটিউবার ও প্রখ্যাত সাংবাদিক মাসুদ কামাল VOA এর জরীপের পরপর নিজেও জরীপ চালিয়ে আরো বিস্ময়কর চিত্র জনসম্মুখে নিয়ে আসেন।
তাঁর জরীপে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৭৮,০০০ হাজার মানুষ, যেখানে সর্বোচ্চ ৫৭% জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষে তাদের ভেটাধিকার প্রয়োগের কথা বলেন। জনমত যাই হোক বিশ্বাস-অবিশ্বাস যার যার ব্যক্তিগত পারসেপশন তবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যত রাজনীতির জন্য বিএনপি কিংবা জামাতের চেয়েও বড় হুমকি নিজ দলের তৃণমূলের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতা কর্মীরা। কারণ উপমাহাদেশের প্রাচীন এ দলটি বিগত কয়েক বছরের পথ চলায় এক বিতর্কিত ইতিহাসে প্রবেশ করেছিল যার পরিনাম আজকের এই পথ হারা পথিকের মতো দল ও কর্মীদের অবস্থা।
আওয়ামী লীগের সভানেত্রীসহ তার পরিবার ও স্বজনদের কারণে শেখ হাসিনার সারা জীবনের সব অর্জন যারা নিমিষেই মাটিতে মিশিয়েছেন তারা হয়তো ছাড় পাবেন না। পাশাপাশি নেত্রীর পাশে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখাত একদল ব্যবসায়ী ও অরাজনৈতিক মহা সিন্ডিকেট প্রতিনিয়ত দল ও দেশের ভুল তথ্য দিয়ে প্রিয় নেত্রীকে যারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিভ্রান্ত করেছিল তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে সময়ের দাবী। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ছাত্র শিবিরের অর্থের বিনিময়ে সু-কৌশলে প্রবেশ আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত ত্যাগী নেতা কর্মীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে কমিটি গঠন, ইউপি চেয়ারম্যান থেকে এমপি পর্যন্ত মনোনয়ন বানিজ্য, নির্বাচনে ত্যাগী নেতাদের সুষ্ঠ নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে তাদের সর্ব শান্ত করে দুর্নীতিবাজ, অসাধু ব্যবসায়ী, মাদক চোরা কারবরী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, দখলবাজদের পক্ষে প্রশাসনকে লেলিয়ে দিয়ে বিজয়ী করার চূড়ান্ত ফলই দলের আজকের এই অবস্থা।
এখন চিন্তার বিষয় জরীপে হয়তো অনেকে আবেগে ভোট দিয়েছেন এটা সত্য কিন্তু পুনরায় আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার অনুমতি যদি পায়ও তথাপি তাদের পথ চলা ততটা সহজ হবে না এটাও মনে রাখতে হবে। কারন আজ যারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি করে দল ও দলের কর্মীদের বারোটা বাজিয়ে আত্ম গোপণে আছেন তারাই তখন মঞ্চে উঠে বড় গলায় বলবে "আমি রাজনীতি করে জেল খেটেছি, সংসার থেকে অনেকদিন বিচ্ছিন্ন ছিলাম, আরো বড় নেতারা বলবে আমি প্রবাসে পালিয়ে থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ গ্রস্থ হয়েছি আরো কত বিলাপ আর ভাওতাবাজি করবে তার হিসাব নেই। আর ত্যাগী ও পোড় খাওয়া নেতারা দূর থেকে দাড়িয়ে ঐ মিথ্যা ও বাটপারীর মহা বাণী শোনবে? তা বোধ হয় আর হবে না। আওয়ামী লীগ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দলে যদি শুদ্ধি অভিযান না চালায় তাহলে "বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ" স্মরণ কালের সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই সবশেষে বিখ্যাত বাংলা ছবি "গোলাপী এখন ট্রেনে" র একটা গান দিয়েই শেষ করি "সময় থাকতে মনা হুশিয়ার!" আবেগঘন মুহূর্তে বলতে ইচ্ছে করে, "এই মুহূর্তে হৃদয় গভীর আবেগে ভেসে চলেছে, যেন সময় থেমে গেছে, আর কেবল অনুভূতিই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।"
মীর্জা বাহাদুর
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।