রোজার অনুশীলন জারি থাকুক সারা বছর
ছবিঃ সংগৃহীত
দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর। এ ঈদের মাধ্যমে ভাঙা হয় দীর্ঘ এক মাসের অতিরিক্ত ইবাদতের ধারাবাহিকতা।
টানা এক মাস ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে সবার মধ্যে গড়ে ওঠে বিশেষ ইবাদতমুখী অভ্যাস। রোজা শেষে যেন কিছুটা ভাটা পড়ে যায় ইবাদত-বন্দেগিতে। আসলে রমজানে তাকওয়া ও খোদাভীতির যে অভ্যাস গড়ে ওঠে তা পুরো বছর চলার পাথেয়। এক মাসের অনুশীলন সারা বছর আমাদের ত্যাগ ও সংযমের জন্য সহায়ক হয়। তাই রমজানের শিক্ষা ভুলে যাওয়া ঠিক না। বরং বছরজুড়ে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা দরকার।
কেননা রোজা নিছক উপবাস থাকা, পানাহার ও কামাচার বর্জনের নাম নয়। এর বিশেষ তাৎপর্য ও দর্শন রয়েছে। রয়েছে এর দৈহিক, আত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা। রমজানের এ সর্বব্যাপী শিক্ষার আলোকে সারা বছর নিজের জীবন পরিচালিত করতে না পারলে নিছকই উপবাস থাকা ছাড়া রমজানে আমাদের আর কোনো অর্জন নেই।
পবিত্র রমজান মুসলমানদের জীবনে ইবাদতের সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলে। কুরআনের সঙ্গে ভালোবাসা স্থাপন করে। হালাল উপার্জনের প্রেরণা দেয় এবং পরিশ্রমের মানসিকতা তৈরি করে। মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও অহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। রমজানের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ত্যাগ ও সংযমের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা তথা খোদাভীতি অর্জন।
রোজা অবস্থায় আমরা মিথ্যা কথা, গিবত, চোগলখুরি, মূর্খতা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত ছিলাম। তেমনি রমজানের পরেও আমাদের সেগুলো বর্জন করে চলতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার এই পানাহার বর্জন করা বা রোজা রাখায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই’ (বুখারি : ১৯০৩)। অর্থাৎ রোজা রেখে যেমন মিথ্যা কথা, অসৎ কাজ ও মূর্খতা পরিহার করতে হয়, তেমনি রমজানের পরেও এই চর্চা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে।
পবিত্র রমজান মাগফেরাত ও ক্ষমা অর্জনের মাস। এ মাস পাওয়ার পরও যারা তাদের আমলনামাকে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত করতে পারেনি রাসুল (সা.) তাদের ধিক্কার দিয়ে বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় ধূসরিত হোক, যে রমজান পেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না’ (তিরমিজি : ৩৫৪৫)।
অতএব রমজান পরবর্তী সময় আমাদের সব ধরনের গুনাহ ও পাপমুক্ত জীবনযাপন করতে হবে। সামনের এগারোটি মাস গুনাহ ও পাপাচার মুক্ত থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকতে হবে। পাশাপাশি পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি থেকে দূরে থাকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, মিতাচার, মিতব্যয়িতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা বছরজুড়ে ধরে রাখা। বরং এভাবেই যেন গড়ে ওঠে পুরোটা জীবন।
কৃপণতা একটি আত্মিক ব্যাধি। মাহে রমজান আমাদের ত্যাগী ও সংযমী হতে শেখায়। কিছু মানুষ আছে যারা অর্জিত সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে। আল্লাহর পথেও খরচ করে না, নিজের জন্যও খরচ করে না। রমজান আমাদের সম্পদ দানের দিকে উৎসাহিত করেছে, নিবেদিত হতে শিখিয়েছে। এ মাসে আমরা অধিক পরিমাণ দান-সদকা, জাকাত, ঈদের দিন সদাকাতুল ফিতরসহ ইত্যাদি নানাভাবে দানের চেষ্টা করে থাকি।
কিন্তু রমজানের পরেও এগারোটি মাস আমাদের সব ধরনের কৃপণতা পরিহার করে আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি বেশি দান-সদকা করা এবং গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানো। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়, তারাই মূলত সফলকাম।’ (সুরা তাগাবুন : ১৬)
একজন মুমিন সর্বদাই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে এমনটাই স্বাভাবিক। শুধু রমজানের জন্যই নয়, একজন মুসলিমের জন্য সর্বাবস্থায় হারাম ভক্ষণ করা কবিরা গুনাহ। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে শরীর হারাম খাবার দ্বারা গঠিত তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (তিরমিজি : ৬১৪)। পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনা ইসলামের অন্যতম ভিত্তি ও মহান আল্লাহর ফরজকৃত একটি বিধান ছিল। আমরা তা যথাযথভাবে আদায় করার চেষ্টা করেছি।
এভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের কুরআন ও সুন্নাহর বিধানগুলো মেনে চলতে হবে। ইসলামের বিধি নিষেধের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ তায়ালা যেসব হালাল করেছেন ও আদেশ করেছেন তা পালনে সচেষ্ট হতে হবে এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা পরিহার করতে হবে।
ঈমান আনার পর প্রথম ফরজ বিধান হলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা। রমজানে আমরা নামাজের ব্যাপারে অনেকটা যত্নবান হলেও রমজানের পর মসজিদে এই উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। কিন্তু নামাজ সর্বাবস্থায় একটি ফরজ বিধান। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য মৃত্যু পর্যন্ত পালনীয় বিধান। হাদিসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন বান্দাকে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে। যদি তা সঠিক হয় তবে তার সব আমলই সঠিক হবে, আর যদি তা বাতিল হয় তবে তার সব আমলই বাতিল হয়ে যাবে।’ (মুজামুল আওসাত : ১৮৫৬)
রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও তাৎপর্য হলো ‘তাকওয়া’ অর্জন। রমজানের রোজা পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য সুরা বাকারায় আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করে বলেন, ‘যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ মুমিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘তাকওয়া’ বা ‘আল্লাহভীতি’। আমার প্রতিটি কাজে, প্রতিটি পদক্ষেপে মহান আল্লাহ সর্বদা দেখছেন। প্রতিটি কর্মের জন্য তাঁর কাছে জবাবদিহিতা করতে হবে এই অনুভূতি সর্বদা মনে দৃঢ়ভাবে জাগ্রত রাখা ও মহান রবের সব ধরনের আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলাই হলো তাকওয়া। মহান আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে দামি যে তাকওয়াবান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানী যে অধিক মুত্তাকি (আল্লাহভীরু)। (সুরা হুজুরাত : ১৩)। রমজান শেষ হলেও রমজানের প্রভাব যেন ধরে রাখতে পারি বাকি এগারোটি মাস, আল্লাহর কাছে সে প্রার্থনা করি।