যশোর অভয়নগরে কৃষকদল নেতা হত্যাকান্ড এবং বাড়ি-ঘরে অগ্নিকান্ডের এক সপ্তাহ পরও আতঙ্ক কাটেনি গ্রামবাসীর

যশোর অভয়নগরে কৃষকদল নেতা হত্যাকান্ড এবং বাড়ি-ঘরে অগ্নিকান্ডের এক সপ্তাহ পরও আতঙ্ক কাটেনি গ্রামবাসীর

ছবি: প্রতিনিধি

টিআই তারেক: ‘‘গুশাইদের যখন মারছিল তখন আমরা ভয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমরা ঐ সময় কারা হামলা করেছে কাউকে দেখিনি। চিনিও না। নামও জানা নেই। ঘরের ভিতর কিছুই নেই। টিভি, ফ্রিজ, আলমারি, মোটরসাইকেল, খাট, জমির কাগজপত্র সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সিদ্ধ ধানের গোলা ধ্বংস করেছে। একটি মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে। রাতটুকু পাশে-আশে থাকছি। দিনে বাড়িতে থাকলেও ঘরে বসবাস করতে পারছি না।’’ এভাবে নিজের বাড়ি-ঘরে হামলা-অগ্নিসংযোগ পরবর্তি অবস্থার বর্ণনা করছিলেন ভুক্তভোগী গৃহবধু বনানী বিশ্বাস।

যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের বাড়েধাপাড়ায় সংগঠিত কৃষকদল নেতা তরিকুল ইসলাম হত্যাকান্ড এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘরে হামলা অগ্নিসংযোগ ভাংচুরের পর চরম আতঙ্গে রয়েছে পরিবারগুলো। গ্রাম এখনো পুরুষ শূন্য। বাড়িতে এখনও উনুন জলেনি। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনেরা দলবেধে আসছেন খাবার নিয়ে। নিরাপত্তা দিতে পাড়াটিতে মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ। মাঝে মাঝে আসছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী, বাম জোট, পূজা উদযাপন পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এলাকাটি পরিদর্শন করছেন। তাদের অর্থসহ কাপড় চোপড় সহায়তা প্রদান করছেন। গত ২২ মে বিকেল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের পিল্টু বিশ্বাসের বাড়িতে নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদল সভাপতি তরিকুল ইসলামকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত। এ ঘটনার পর ওই রাতে বাড়েধাপাড়ার ১৩টি পরিবারের ২০টি বাড়ি-ঘরে হামলা অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। হত্যা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দুটি আলাদা মামলা হয়েছে।
হত্যাকান্ডের চারদিন পর ২৬ মে সোমবার নিহত তরিকুল ইসলামের ভাই রফিকুল ইসলাম টুলু ১১ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা করেন। এতে অজ্ঞাত ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামী করা হয়েছে। মামলার রাজনৈতিক ও মাছের ঘেরের ইজারা নিয়ে দ্ব›েদ্বর জেরে তরিকুল ইসলামকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। 

অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ডহর মশিয়াহাটী গ্রামের সুশান্ত বিশ্বাসের স্ত্রী কল্পনা বিশ্বাস বাদী হয়ে ১০০-১৫০ জন অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। বসতবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিকান্ডে ঘটনায় ৪৯ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনার সাথে জড়িত ৩ জনকে পুলিশ আটক করেছে। তারা হলেন, অভয়নগর উপজেলার সরখোলা গ্রামের গোলাম হোসেনের ছেলে ইমন হোসেন (৩০), একই গ্রামের মতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে রিফাতুল ইসলাম রাতুল (২৩) ও বুইকারা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন (২৭)। 

বাদী কল্পনা বিশ্বাস এজাহারে উল্লেখ করেন, গত ২২ মে বৃহস্পতিবার কৃষকদল নেতা ধোপাদী গ্রামের ইব্রাহিমের ছেলে তরিকুল ইসলাম হত্যাকান্ডের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে অজ্ঞাতপরিচয় ১০০ থেকে ১৫০ জন দেশীয় অস্ত্র ও পেট্রোলসহ আমার বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় তারা বসতঘরের ভেতরে ঢুকে ভাংচুর শুরু করে এবং নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মালামাল লুট করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। 

অভয়নগর থানার ওসি মো: আব্দুল আলীম বলেন, কল্পনা বিশ্বাসের মামলায় ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামী ফিরোজ খান, সাগর বিশ্বাস, দিনেশ ও সুমন নামে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পলাতক আসামীদের আটকে অভিযান চলমান রয়েছে। 
এদিকে উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম-আহবায়ক মাসুদ পারভেজ সাথী ও পৌর যুবদলের যুগ্ম-আহবায়ক আকরাম আকতার কোরাইশী পাপ্পুর নামে মামলা করায় ২৬ মে রাতে থানা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। পরে ২৭ মে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসময় মামলা থেকে যুবদল নেতাদের নাম তুলে নিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় বিক্ষোভকারীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২২ মে বৃহস্পতিবার নাগাদ সন্ধ্যা অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের বিল বোকড়ের আড়াইশ’ বিঘার একটি মাছের ঘের ইজারা চুক্তি করতে মোটরসাইকেলে ডহর মশিয়াহাটী বাড়েধাপাড়ার পিল্টু বিশ্বাসের বাড়িতে যান নওয়াপাড়া পৌর কৃষকদলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী সুমন। পিল্টুর বাড়িতে যাওয়ার পথে স্থানীয় মিষ্টির দোকান থেকে দুই কেজি মিষ্টিও নেন তরিকুল । পিল্টুর বাড়িতে প্রবেশ করতেই তাদের দুজনকে ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। তরিকুল, সুমন ও স্ত্রীর উপস্থিতিতে ঘেরের চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করে পিল্টু বিশ্বাস। এরপর তরিকুল স্বাক্ষর শেষ করে চুক্তিনামা চুড়ান্ত করেন। এমন সময় সেখানে উপস্থিত হয় ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী ছয় যুবক। তাদের কারও পরনে থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট, কেউ বা ফুল প্যান্ট পরা। যুবকদের মধ্যে একজন অন্যদের উদ্দেশ্যে করে বলে তোদের কি জন্য এখানে এনেছি। এর পরেই কেউ কোমর থেকে বের করে পিস্তল, কেউ বা বাপাতি, রামদা, ছোরা, চাইনিজ কুড়াল। কিছু বলার আগেই একজন তরিকুলের গলা জাপটে ধরে মাথায় পিস্তল তাক করে। এরপর টানতে টানতে নিয়ে যায় পিল্টু ঘরের মধ্যে। সেখানে তাকে মাথায়, পেটে ও ডান কনুইয়ের ওপরে তিনটি গুলি করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করতে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপায়। ছয়জন মিলে নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটায় মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের মধ্যে। হত্যা নিশ্চিত করে পায়ে হেটেই সন্ত্রাসীরা চলে যায় সুজাতপুরের দিকে। এরমধ্যে আক্রমণকারীদের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন সুমন।

ঘটনার পর জেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নগদ ৫ হাজার টাকা, টিন ও কাপড় বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, বাম জোট ও পুজা উদযাপন পরিষদের নেতারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিবারগুলোর পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। উভয় ঘটনার সাথে জড়িতদের দ্রæত গ্রেফতার এবং  দ্রæত বিচারের দাবি জানিয়েছেন। হত্যাকান্ডকে ভিন্ন খাতে মোড় দিতে নিরিহ গ্রামবাসীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ঘটানো হতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন নেতৃবৃন্দ। তারা মনে করছেন, হত্যাকান্ডটিকে পাশ কাটিয়ে গ্রামের মতুয়া সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা অগ্নিসংযোগকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে একটি মহল।