রহিমা বেগমের যাত্রা: হতাশা থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল

রহিমা বেগমের যাত্রা: হতাশা থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল

ছবি: প্রতিনিধি

খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবন ঘেষা ছোট্ট একটি গ্রাম খোনা। এই গ্রামেরই এক কোণে বসবাস করেন রহিমা বেগম, একজন বিধবা নারী। তার সংসারে রয়েছে দুই ছোট ছেলে ও এক বৃদ্ধা মা। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে রহিমার কাঁধে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে মৃগী (এপিলেপসি) রোগে ভুগছে, যার ফলে প্রতিদিনের কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া তার জন্য অনেক কঠিন।

রহিমার পরিবার কোন স্থায়ী ঘরবাড়ি ছাড়াই স্হানীয় প্রতিবেশীর একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে কোনোমতে মাথা গুঁজে থাকত। মা’র ছোট একটা ভাতা দিয়েই চলে তাদের ন্যূনতম খরচ, আর রহিমা মাঝেমধ্যে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মে সাহায্য করে কিছু আয় করেন। যদিও তার নামে সামান্য একটু জমি আছে, কিন্তু সেই জমিতে একটি নিরাপদ ঘর নির্মাণ করার মতো সামর্থ্য নেই তার।

প্রতিবার বর্ষা এলেই শুরু হয় তাদের দুঃস্বপ্ন। টিনের ছাউনি থেকে চুঁইয়ে পড়ে পানি, কাদামাটিতে তলিয়ে যায় উঠান, আর ঝড়ের সময় ছেলেদের নিয়ে কোথাও নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার উপায় থাকে না। মায়ের বয়স হয়েছে, অসুস্থ রহিমার পক্ষে সব সামলানো প্রায় অসম্ভব।

খোনা গ্রামের আরএইচএল প্রকল্পের খোনা-৩ জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন দল (CCAG) গ্রামবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের চিহ্নিত করে। এই প্রক্রিয়ায় রহিমা বেগমের নাম উঠে আসে। তার শারীরিক অসুস্থতা, ঘরবাড়ির অভাব এবং দুই সন্তান ও বৃদ্ধা মায়ের দেখভালের দায়িত্ব তাকে করে তোলে একেবারে অগ্রাধিকারপ্রাপ্তদের একজন।

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, রহিমাকে জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল একটি পাকা ঘর দেওয়া হবে। শুরু হয় ঘর নির্মাণের কাজ। পাকা মেঝে, মজবুত দেয়াল, উঁচু ভিত্তি—সব মিলিয়ে একটি নিরাপদ বাসস্থান তৈরি হয়। শুধু ঘর নয়, তার উঠান উঁচু করে দেওয়া হয় যাতে জলাবদ্ধতা না হয়। দেওয়া হয় ৩০০০ লিটারের বিশুদ্ধ পানির ট্যাংক, বন্ধু চুলা, স্বাহ্যসম্মত পায়খানা এবং ১০০ ওয়াটের সৌর বিদ্যুৎ সুবিধা, যাতে রাতে আলো জ্বলে, মোবাইল চার্জ হয়, সন্তানরা পড়াশোনা করতে পারে।

ঘর পাওয়ার পর রহিমা বলেন, "এই ঘরটা আমার জন্য শুধু ইট-বালি-সিমেন্ট না, এটা আমার ছেলেদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। আগে ঝড় এলেই বুক কাঁপত, এখন মনে সাহস পাই।"

রহিমার মুখে ফোটে দীর্ঘদিন পর একচিলতে হাসি। তাদের জীবনে এখন একটু স্বস্তি, একটু নিরাপত্তা, আর সবচেয়ে বড় কথা—আছে একটা নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।