এশার পর ঘুম: নববী রুটিনের হেকমত
ছবি: সংগৃহীত
ঘুম আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত এবং মানুষের জন্য প্রশান্তি ও বিশ্রামের মাধ্যম। মহানবী (স.)-এর জীবনাচার ঘুমের ক্ষেত্রেও মুসলিম উম্মাহর জন্য পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা বহন করে। তাঁর ঘুমের সময়, পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট আমলগুলো অনুসরণ করাই হলো প্রকৃত সুন্নতের অনুসরণ।
ঘুমের সময় ব্যবস্থাপনা
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) এশার নামাজ এক-তৃতীয়াংশ রাত দেরি করে পড়া পছন্দ করতেন। তবে তিনি এশার আগে ঘুমানো এবং এশার পর অযথা গল্পগুজব করা অপছন্দ করতেন। (সহিহ বুখারি: ৫৯৯) উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বলেন, ‘মহানবী (স.) এশার নামাজের আগে ঘুমাতেন না এবং এশার পর অহেতুক কথাবার্তা বা গল্পগুজব করে সময় নষ্ট করতেন না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৭০২)
আলেমদের মতে, এশার পর বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বা কল্যাণকর কোনো বিষয় ছাড়া অযথা আলাপচারিতায় লিপ্ত হওয়া মাকরুহ।
দ্রুত ঘুমিয়ে শেষ রাতে ইবাদতের হেকমত
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রতিরাতে শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে আসমানের নিকটতম স্তরে অবতরণ করেন এবং বলেন, ‘কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে তা দেব; কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (সহিহ বুখারি: ১১৪৫)
এই সময় আল্লাহর প্রিয় বান্দারা ঘুম ত্যাগ করে ইবাদতে লিপ্ত হন। অথচ যারা রাতের প্রথমাংশ গল্পগুজবে আর শেষাংশ ঘুমে কাটিয়ে দেয়, তারা এ মহান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
এছাড়াও ফজরের সময়টি বরকতময়। দেরিতে ঘুমিয়ে সকালের এই সময়ে ঘুমিয়ে থাকা বোকামি। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তার এক সন্তানকে ভোরবেলা ঘুমাতে দেখে বলেছিলেন, ‘ওঠো! তুমি কি এমন সময়ে ঘুমিয়ে আছ, যখন রিজিক বণ্টন করা হচ্ছে?’ (জাদুল মায়াদ: ৪/২৪১)
তরুণদের জন্য শিক্ষা
যুবক বয়সে ইবাদত অত্যন্ত মূল্যবান। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কেয়ামতের দিনে আল্লাহ যাদেরকে আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, তাদের মধ্যে থাকবে সেই যুবক, যে যৌবনকাল আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে। অথচ আজকের অনেক তরুণ রাতকে অবাধ ভেবে ইন্টারনেট ও ডিভাইসের অপব্যবহারে সময় নষ্ট করছে। রাতকে দিন আর দিনকে রাত বানিয়ে তারা ঈমান ও আমলকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই তরুণদের উচিত নববী ঘুমের রুটিন অনুসরণ করে সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করা।
ঘুমের সুন্নত পদ্ধতি
- নামাজের অজুর মতো অজু করে ডান কাত হয়ে শোয়া। (সহিহ বুখারি: ৬৩১১)
- বিছানা ঝেড়ে নেওয়া এবং নির্দিষ্ট দোয়া পড়া। (সহিহ বুখারি: ৬৩১১)
- সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দিয়ে মাসেহ করা। (সহিহ বুখারি: ৫০১৭)
- শোয়ার সময় দোয়া: ‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া।’ (তিরমিজি: ১৯০)
নববী ঘুমের ভারসাম্য
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম ‘তিব্বুন-নববী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নবীজির ঘুম ছিল পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি রাতের প্রথম অংশে ঘুমাতেন এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জাগ্রত হয়ে মিসওয়াক, অজু ও নামাজ আদায় করতেন।
কোরআনের দিকনির্দেশনা
- আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম এবং রাতকে করেছি আবরণ। (সুরা নাবা: ৯-১০)
- তাঁর নিদর্শনগুলোর মধ্যে আছে রাত ও দিনে তোমাদের ঘুম এবং তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান। (সুরা রুম: ২৩)
নবীজির বিছানা
রাসুলুল্লাহ (স.) সাধারণত চামড়ার বিছানায় ঘুমাতেন, যার ভেতরে খেজুর গাছের আঁশ ভরা থাকত। (তিরমিজি: ২৫৩)
একবার হজরত ওমর (রা.) নবীজির ঘরে প্রবেশ করে দেখতে পান, তাঁর শরীরে মাদুরের দাগ পড়েছে। কাঁদতে শুরু করলে নবীজি (স.) বলেন, ‘হে ওমর! তুমি কি চাও না তাদের জন্য দুনিয়া হোক আর আমাদের জন্য হোক আখিরাত?’ (মুসনাদে আহমদ)
মহানবী (স.)-এর ঘুমসংক্রান্ত সুন্নতগুলো কেবল শারীরিক বিশ্রামের উপায় নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদতের ব্যবস্থা। এশার পর দ্রুত শয়ন, শেষ রাতে জাগ্রত হওয়া, সুন্নত অনুসারে শোয়া ও জিকির-দোয়া পড়া—সবকিছুই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ বয়ে আনে। নববী রুটিন অনুসরণ করে আমরাও ঘুমকে ইবাদতে রূপান্তরিত করতে পারি।