পুরুষ দিবস: দায়িত্বের আয়না, অন্যায়ের প্রতিবাদ, আর মানবিকতার পুনর্জাগরণ

পুরুষ দিবস: দায়িত্বের আয়না, অন্যায়ের প্রতিবাদ, আর মানবিকতার পুনর্জাগরণ

ছবি: সংগৃহীত

পুরুষ দিবস একদিনের হঠাৎ আবিষ্কার নয়। ১৯৯৪ সালে প্রস্তাব করা হলেও এর শেকড় যায় অনেক পেছনে। ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে যে ‘রেড আর্মি অ্যান্ড নেভি ডে’ পালিত হতো— সেটা ছিল পুরুষদের বীরত্ব, ত্যাগ আর দায়িত্বকে সম্মান জানানো একটি শক্ত ভিত্তি। পরে ২০০২ সালে নাম পাল্টে হয় ‘ডিফেন্ডার অফ দ্য ফাদারল্যান্ড ডে’। নারী দিবসের মতোই গুরুত্ব দিয়ে রাশিয়া, ইউক্রেনসহ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশে এই দিন উদযাপন করা হতো।

ষাটের দশক থেকে পুরুষ দিবস নিয়ে ভাবনা শুরু। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, সমাজে পুরুষদের অবদান, সংকট, মানসিক চাপ—এসব কি মূল্যায়ন পাওয়া উচিত নয়? ১৯৬৮ সালে সাংবাদিক জন পি. হ্যারিস এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। পরে নব্বই দশকে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও মাল্টার কিছু প্রতিষ্ঠান ফেব্রুয়ারিতে দিবস পালনের চেষ্টা করে, কিন্তু সাড়া কম ছিল। তবুও থেমে থাকেনি আন্দোলন। শেষে বিশ্ব একমত হলো—১৯ নভেম্বরই আন্তর্জাতিক পুরুষ দিবস।

এই দিনটার উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। পুরুষকে বড় করে দেখানো নয়, বরং মানুষ হিসেবে তার দায়, সংগ্রাম, অবদান, মানসিক চাপ, স্বাস্থ্য—এসবের প্রতি সচেতনতা তৈরি করা।

উদ্দেশ্যগুলো হলো—

পুরুষ ও বালকদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি
নারী–পুরুষের সম্পর্ককে আরও সুস্থ ও সম্মানজনক করা
সত্যিকারের লৈঙ্গিক সমতা প্রতিষ্ঠা
ইতিবাচক পুরুষ চরিত্র ও আদর্শকে সামনে আনা
পুরুষ ও বালকদের নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করা
জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অর্জন ও অবদানকে উদযাপন

আসলে কথা একটাই। যেমন নারী দিবস নারীর মর্যাদাকে আলোয় আনে, পুরুষ দিবসও তেমনভাবেই মনে করিয়ে দেয়— সমাজের ভারসাম্য তখনই থাকে, যখন দুই পক্ষেরই কষ্ট, অবদান, শক্তি আর দুর্বলতাকে সমানভাবে দেখা হয়।

পুরুষ একটি শব্দ— যার ভেতরে রয়েছে শক্তি, দায়িত্ব, ভালোবাসা যেমন আছে, তেমনই আছে ভুল, অহংকার, অবহেলা ও অন্যায়ের ছায়াও। প্রতিটি জিনিসের মতোই ‘পুরুষ’ শব্দটির পজিটিভ আর নেগেটিভ—দুটো দিকই সত্য।

ইতিবাচক পুরুষ—যারা পরিবার গড়ে, সমাজ আগলে রাখে,মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার নিজেকে জড়িয়ে রাখে। যে পুরুষ বাবা হয়ে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্ন ত্যাগ করে। যে ভাই বোনকে পাহারা দেয়। যে স্বামী স্ত্রীকে সম্মান দেয়, ভালোবাসে, সঙ্গী করে পথ চলে। যে বন্ধু বন্ধুর দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়— তাদের অবদানেই তো সমাজ বাঁচে, পরিবার টিকে থাকে।

তাদের ঘাম, তাদের ত্যাগ, তাদের নীরব কষ্ট—সবই সমাজের অবলম্বন।তারা নীরবে তাদের দায়িত্ববোধ, তাদের ত্যাগের মাধ্যমেই আলো জ্বালে এই সমাজে। নেতিবাচক পুরুষ—সমাজকে দূষিত করার অন্ধকার মুখ

কিন্তু সত্য আরেকটি দিকও আছে। আজকের সমাজে এমন পুরুষও দেখা যায়— যারা নারীর সম্মান বোঝে না। যারা ভাই, স্বামী বা বাবার দায়িত্ব বোঝে না। যারা ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করে সমাজকে কলঙ্কিত করে,যারা মনে করে নারী দুর্বল, তাই অসহায়।তারা নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে পারে না।

ইসলামে পুরুষের জন্য স্পষ্ট নির্দেশ— “চোখের পর্দা করো।” কিন্তু অনেক পুরুষ এই নির্দেশ ভুলে যায়। ভুলে যায় যে নারীকে সম্মান করা শুধু মানবিকতার নয়—ধর্মীয় দায়িত্বও। এছাড়াও কিছু পুরুষ আছে যারা সংসারের দায়িত্ব নিতে চায় না।

এছাড়াও কিছু পুরুষ আছে যারা পরিবার গড়ার চেয়ে ভাঙতে বেশি অবদান রাখে। নারীর কষ্ট, সন্তানের ভবিষ্যৎ—কোনোটাই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে পারিবারিক বন্ধন মূল্যহীন। এই ধরনের পুরুষদের কারণে নারীর স্বপ্ন ভেঙে যায়, পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়, সমাজে বিভক্তি বাড়ে।

কিন্তু সব পুরুষই একই নয়—এটাই সত্য। কিছু লোকের অপরাধে পুরো পুরুষ জাতিকে দোষ দেওয়া অন্যায়। কারণ পুরুষরাই তো— আমাদের বাবা, আমাদের ভাই, আমাদের স্বামী, আমাদের বন্ধুই।

নারী-পুরুষ দুজনেই জীবনের দুইটি স্তম্ভ। একটি ভাঙলে পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে না। একটি উপেক্ষা করলে সমাজ এগোয় না। পুরুষ দিবস তাই শুধুই উদযাপনের দিন নয়— এটা আত্মশুদ্ধির দিন। এই দিনটি মনে করিয়ে দেয়— মানবিকতা ছাড়া পুরুষত্ব পূর্ণ হয় না। দায়িত্বহীনতা কখনো শক্তি নয়। নারীকে সম্মান করা ঈমানের অংশ। ক্ষমতা নয়, আচরণই একজন পুরুষের আসল পরিচয়। 

ভালো পুরুষ সমাজকে তুলে ধরে, আর খারাপ পুরুষ সমাজকে নামিয়ে দেয়। একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, সম্মানযোগ্য সমাজ তখনই তৈরি হবে—যখন নারী-পুরুষ দুজনেই সমান মর্যাদা পাবে। পুরুষেরও মানসিক কষ্ট আছে। নারীরও নিরাপত্তার চাহিদা আছে। দুজনেই ক্লান্ত হয়, ভেঙে পড়ে, আবার দাঁড়ায়। 

এই দিনটি আমাদের শেখায়—মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখা। সম্মান, দায়িত্ব ও মানবিকতার পথে ফিরিয়ে আনা। আর সমাজকে একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়া।