প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতি: 'শক্তের ভক্ত নরমের যম'- শিক্ষক বনাম সচিবালয়!
জাকিরুল ইসলাম
দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে চাকরি করেন। জাতিকে পথ দেখানো এই কারিগরদের বেতন-ভাতা, মর্যাদা এবং পদোন্নতির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। যোগ্যতার নিরিখে এই বঞ্চনা থেকেই তাদের বারবার পথে নামতে হয়। সম্প্রতি শিক্ষকদের আন্দোলন, ১১তম গ্রেডের আশ্বাস, আন্দোলন প্রত্যাহার এবং এরপর সেই আশ্বাস বাস্তবায়নে কোনো অগ্রগতি না দেখে কর্মবিরতিতে যাওয়া পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ সকলের জানা।
কঠোরতার আশ্রয় নিয়ে শিক্ষকরা যখন পরীক্ষা বর্জন করলেন, সরকার দ্রুত কঠোর অবস্থান নেয়—শিক্ষকদের বিরুদ্ধে হুমকি, নোটিশ এবং ৪৩ জনকে দূর-দূরান্তে শাস্তিমূলক বদলি করার মতো নজিরবিহীন ব্যবস্থা নেওয়া হলো। শিক্ষকদের প্রতি আসে বিরূপ মন্তব্য; পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের এখন অনেক বেতন, তারা ক্লাসে আন্তরিক বা ডেডিকেটেড নন। অনেকেই বলেন, তারা কম বেতন জেনেই চাকরিতে এসেছেন।
কিন্তু এই কঠোরতার উল্টো পিঠে যখন আমরা সরকারের আরেক অংশের দিকে তাকাই, তখন প্রশাসনের 'দ্বিচারিতা' প্রকট হয়ে ওঠে।
গত ১০ ডিসেম্বর (বুধবার) সচিবালয়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের নতুন দাবি-২০ শতাংশ 'সচিবালয় ভাতা'-র জন্য আন্দোলন করেন। এটি তাদের চাকরির পূর্বনির্ধারিত সুবিধা ছিল না। এই দাবি আদায়ে তারা যে পথ অবলম্বন করেন, তা যেকোনো মানদণ্ডে ছিল চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ। তারা অর্থ উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদার একজন ব্যক্তি)-কে ৬ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ করে রাখেন, তার দরজার সামনে হ্যান্ড মাইক নিয়ে 'ভুয়া ভুয়া' বলে স্লোগান দেন। শেষে পুলিশি পাহারায় অপমানজনকভাবে উপদেষ্টাকে সচিবালয় ত্যাগ করতে হয়।
শিক্ষকরা সরকারের কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করা বা অপমান করার মতো দুঃসাহস দেখাননি। তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করেছেন। ফলস্বরূপ তাদের ভাগ্যে জুটল বদলি, শোকজ নোটিশ এবং সমাজের উচ্চ মহলের তীব্র সমালোচনা।
পক্ষান্তরে, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মন্ত্রী পদমর্যাদার একজন ব্যক্তিকে অবরুদ্ধ করার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা বদলির ঘটনা চোখে পড়ল না। বরং, দাবি পূরণে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির আশ্বাস দেওয়া হলো। সমাজে বা সরকারের উচ্চ মহলে এই চরম ঔদ্ধত্যের কোনো সমালোচনাও শোনা গেল না।
এখানেই সেই পুরোনো প্রবাদটি সত্য হয়ে ওঠে: "শক্তের ভক্ত নরমের যম।"
প্রশাসন যেন স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: শিক্ষকরা হলেন 'নরম', যাদের কঠোর হাতে দমন করা যায়, যাদের উপর আইন-কানুন ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগ করা যায়। আর সচিবালয়ের ক্ষমতাধর নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন 'শক্ত', যাদের ঔদ্ধত্যও মেনে নিতে হয় এবং যাদের দাবি রাতারাতি পূরণ করতে সরকার ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
এটি স্পষ্টতই একই দেশে দুই রকম নীতির প্রতিফলন।
জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে নিয়োজিত শিক্ষকদের ন্যায্য আন্দোলনকে কঠোর হাতে দমন করা, তাদেরকে দূর-দূরান্তে শাস্তিমূলক বদলি করা এবং তাদের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করা নিঃসন্দেহে অন্যায়। অন্যদিকে, ক্ষমতাশালীদের চরম ঔদ্ধত্যকে নীরব সম্মতির মাধ্যমে প্রশ্রয় দেওয়া এবং তাদের দাবি মেনে নেওয়া প্রশাসনের বৈষম্যমূলক মানসিকতার চরম উদাহরণ।
শিক্ষকদের প্রতি এই অবিচার ও প্রশাসনের দ্বিচারিতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। শিক্ষকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে, তাদের ন্যায্য দাবিগুলো দ্রুত পূরণ করা হোক এবং শাস্তিমূলক বদলির শিকার শিক্ষকদের বদলির সিদ্ধান্ত বাতিল করে সুবিচার নিশ্চিত করা হোক। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হলে শিক্ষকদের সম্মান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। কারণ, শিক্ষকদের মন ভেঙে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
লেখক : শিক্ষক, কুষ্টিয়া জিলা স্কুল।